২৯ দিনে ১২ বার এভারেস্ট আরোহণের সমান পথ পেরিয়ে নতুন রেকর্ড সোফি উডসের

মাত্র ২৯ দিনে ইউরোপের আটটি দেশ পেরিয়ে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার পথ দৌড়ে পাড়ি দিয়েছেন আলট্রা-রানার সোফি উডস। কঠিনতম পর্বতপথগুলোর একটি ভিয়া আলপিনা সবচেয়ে কম সময়ে সম্পন্ন করার বিশ্বরেকর্ড গড়ার লক্ষ্য নিয়েই এই দীর্ঘ ও চ্যালেঞ্জিং যাত্রায় নেমেছিলেন তিনি।

ভিয়া আলপিনা হলো ইউরোপের আল্পস পর্বতমালা ঘিরে বিস্তৃত একটি বিখ্যাত দীর্ঘ পথ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, কঠিন আবহাওয়া এবং দীর্ঘ পথের কারণে এটি বিশ্বের অন্যতম কঠিন ট্রেইল হিসেবে পরিচিত। অ্যাথলেটদের কাছে ভিয়া আলপিনা একটি বড় চ্যালেঞ্জের নাম। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পথ সম্পূর্ণ করতে পেরেছেন এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম।
সোফি উডস যে দূরত্ব অতিক্রম করেছেন, তা প্রায় ১২ বার মাউন্ট এভারেস্টে ওঠার সমান। এর আগে সবচেয়ে কম সময়ে ভিয়া আলপিনা পথ পাড়ি দেওয়ার রেকর্ড ছিল ব্রিটিশ দৌড়বিদ জেক ক্যাটারলের দখলে। তিনি ২০২৪ সালে ৩৫ দিনে এই পথ অতিক্রম করেছিলেন।
৪২ বছর বয়সী সোফি উডস সেই রেকর্ড ভাঙার লক্ষ্য নিয়ে গত ৪ জুলাই ইতালি থেকে তার দৌড় শুরু করেন। এরপর তিনি স্লোভেনিয়া, অস্ট্রিয়া, জার্মানি, লাইখটেনস্টাইন, সুইজারল্যান্ড ও ফ্রান্স হয়ে শেষ পর্যন্ত পৌঁছান মোনাকোর ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে। গত শনিবার সেখানে শেষ হয় তার এই অসাধারণ যাত্রা।

তবে পুরো পথজুড়েই তাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে নানা প্রতিকূলতার। দুটি দাবদাহ, ভয়াবহ ঝড় এবং দাবানলের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হয়েছে তাকে ও তার দলের সদস্যদের।
বিশেষ করে ইতালিতে দাবানলের কারণে নির্ধারিত পথ পরিবর্তন করতে হয়। আগুন এড়িয়ে নিরাপদ পথে যেতে গিয়ে তাকে অতিরিক্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পথ দৌড়াতে হয়েছে। পাশাপাশি বিকল্প পথে প্রায় ২০০ মিটার উচ্চতায় উঠতেও হয়েছে।
এই দীর্ঘ যাত্রার শেষ দিকে শারীরিক ক্লান্তি আরও বেড়ে যায়। সময়ের সীমার মধ্যে লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে শেষ কয়েক দিন প্রায় ঘুমহীন কাটাতে হয়েছে তাকে। সোফি জানান, অনেক সময় তিনি মাত্র দেড় থেকে আড়াই ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ পেয়েছেন।

নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সোফি উডস বলেন, ‘কিছু কিছু সময় আমার মনে হয়েছিল, আমি জানি না কীভাবে এটি শেষ করব। আমি কখনো থামতে চাইনি, তবে এর বিশালতা মাঝে মাঝে আমাকে ভীষণভাবে ভাবিয়ে তুলেছিল’।
তিনি আরও বলেন, ‘আমি হয়তো সবচেয়ে দ্রুত দৌড়াতে পারি না, কিন্তু আমি জানি কীভাবে পাহাড়ে দীর্ঘ সময় ধরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয় এবং যখন শরীরের সব জায়গায় ব্যথা করে, তখনও কীভাবে এগিয়ে যেতে হয়’।
দৌড়ের বিভিন্ন পর্যায়ের শারীরিক কষ্টের কথা বলতে গিয়ে সোফি জানান, প্রথম সপ্তাহটি ছিল সবচেয়ে কঠিন। তার শরীরের বিভিন্ন অংশ ফুলে গিয়েছিল এবং প্রচণ্ড ব্যথা ছিল। দ্বিতীয় সপ্তাহও খুব একটা ভালো কাটেনি। তবে তৃতীয় সপ্তাহে শরীর ধীরে ধীরে এই কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে শুরু করে।
ইতালিতে দাবানলের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি বলেন, এর আগে তিনি দাবানলের কাছাকাছি গিয়েছেন এবং সেগুলোর ভয়াবহতা সম্পর্কে জানেন। তাই তিনি, তার ক্রু এবং দলের অন্য সদস্যরা কেউই আগুনের ঝুঁকির মধ্যে যেতে চাননি। এ কারণে তারা বিকল্প পথের পরিকল্পনা করেন।
সোফি বলেন, পথে চলার সময় অনেক কিছুই পরিবর্তন করতে হয়েছে। আগের অনেক হিসাবই মিলেনি। প্রতিটি দিন ছিল দীর্ঘ এবং অনেক সময় অতিরিক্ত উচ্চতায় উঠতে হয়েছে। তবে পুরো যাত্রায় দলের সহযোগিতা তাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।
ভিয়া আলপিনা পাড়ি দিতে সোফি উডস ৩০ দিনের বেশি সময় নিতে চাননি। তার মতে, এই চ্যালেঞ্জ সম্পন্ন করার জন্য ৩০ দিনই ছিল তার কাছে যথেষ্ট সময়।

তিনি বলেন, ‘আমি জানতাম যে আমি দৃঢ় এবং সক্ষম। কিন্তু এই যাত্রা আমাকে আমার সীমার বাইরেও পরীক্ষা করেছে’।
আলট্রা-রানিংয়ে শুধু শারীরিক সক্ষমতা নয়, প্রয়োজন প্রচণ্ড মানসিক শক্তি ও দীর্ঘ প্রস্তুতি—এ কথাও উল্লেখ করেন সোফি। তবে আপাতত আর এমন কোনো কঠিন দৌড়ে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা নেই তার।
এখন কিছুটা বিশ্রাম নিতে চান এই আলট্রা-রানার। তার ভাষায়, আপাতত বড় কোনো দৌড় নয়, বরং ঘরে বসে নেটফ্লিক্স দেখে শান্ত সময় কাটাতেই বেশি আগ্রহী তিনি।



