আজকের দিনটি শুধুই বোনের জন্য

কখনো একই চকলেটের শেষ টুকরোটি নিয়ে যুদ্ধ, কখনো টিভির রিমোট দখলের লড়াই, আবার কখনো মায়ের কাছে কে আগে নালিশ করবে- শৈশবের এমন অসংখ্য ছোটখাটো ঝগড়ার সাক্ষী বোন। অথচ সেই বোনই যখন জীবনের কোনো কঠিন সময়ে পাশে এসে দাঁড়ায়, তখন বোঝা যায়- শৈশবের সেই ঝগড়াগুলো আসলে ভালোবাসারই অন্যরকম প্রকাশ।
আজ সিস্টার্স ডে বা বোন দিবস। বোনকে নিয়ে আলাদা করে বলার দিন। যদিও সত্যি বলতে, বোনের জন্য ভালোবাসা প্রকাশের কোনো নির্দিষ্ট দিনের প্রয়োজন হয় না। তবু ব্যস্ত জীবনের ভিড়ে সম্পর্কের মানুষগুলোকে একটু নতুন করে মনে করার জন্য এমন একটি দিন যেন অজুহাত হয়ে আসে।

শৈশবের সেই ছোট্ট যুদ্ধগুলো
ভাই-বোনের সম্পর্কের শুরুটা অনেক সময় বন্ধুত্ব দিয়ে নয়, বরং প্রতিযোগিতা দিয়ে। কে মায়ের বেশি আদরের, কে আগে টিভি দেখবে, কার খেলনাটা বেশি সুন্দর- এসব নিয়েই চলে তর্ক-বিতর্ক। কখনো বোনের প্রিয় জিনিস লুকিয়ে দেওয়া, কখনো তার নতুন জামা নিয়ে মজা করা, আবার কখনো তার গোপন কথা অন্যের কাছে বলে দেওয়ার ভয় দেখানো- শৈশবের এসব দুষ্টুমিই একসময় হয়ে ওঠে সবচেয়ে মধুর স্মৃতি। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, বাইরের কেউ যখন ভাই বা বোনকে কষ্ট দেয়, তখন সেই পুরোনো ঝগড়াটে মানুষটিই সবার আগে ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। নিজেরা যতই ঝগড়া করুক, বাইরের কারও কাছে একে অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ শুনতে যেন রাজি নয়!
বড় বোন মানেই যেন দ্বিতীয় মা
অনেক পরিবারেই বড় বোনের ভূমিকা একটু আলাদা। ছোটদের দেখাশোনা করা, মায়ের বকুনি থেকে তাদের বাঁচানোর চেষ্টা করা, আবার প্রয়োজন হলে নিজেই শাসন করা- সবকিছুতেই যেন তার অদৃশ্য দায়িত্ব থাকে। ছোট ভাইয়ের স্কুলব্যাগ গুছিয়ে দেওয়া, বোনের চুল বেঁধে দেওয়া, পরীক্ষার আগে নোট তৈরি করে দেওয়া কিংবা ছোটদের পছন্দের খাবারটা নিজের ভাগ থেকে দিয়ে দেওয়া- এসব ছোট ছোট কাজের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে বড় বোনের ভালোবাসা। অথচ এই বড় বোনটিরও হয়তো মন খারাপ হয়। তারও হয়তো ভয় থাকে, কষ্ট থাকে, নিজের জন্য কিছু পাওয়ার ইচ্ছা থাকে। কিন্তু পরিবারের ছোটদের সামনে অনেক সময় সে সেসব প্রকাশ করে না। বড় হয়ে আমরা বুঝতে পারি, শৈশবে যাকে ‘বকুনি দেওয়া মানুষ’ মনে হতো, সে আসলে কতটা নিঃশব্দে আগলে রেখেছিল আমাদের।
ছোট বোনের দুষ্টুমির আড়ালেও ভালোবাসা
ছোট বোনের গল্পটা আবার অন্যরকম। অনুমতি না নিয়েই বড় বোনের জামা পরে ফেলা, আলমারি ঘেঁটে প্রিয় পোশাক নিয়ে নেওয়া, বইয়ের পাতায় আঁকিবুঁকি করা কিংবা প্রিয় কোনো জিনিস লুকিয়ে রেখে মজা করা- এসব যেন তার জন্মগত অধিকার! এসব নিয়ে ঝগড়াও কম হয় না। কিন্তু সেই ছোট বোনটিই যখন বড় বোন অসুস্থ হয়, তখন সবচেয়ে বেশি উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়ে। বড় বোনের চাকরি হলে সবচেয়ে বেশি আনন্দ করে, মন খারাপ হলে চুপচাপ পাশে এসে বসে থাকে।
ভালোবাসা সব সময় ‘ভালোবাসি’ শব্দে প্রকাশ পায় না। কখনো তা প্রকাশ পায় এক কাপ চায়ে, কখনো ফোনের ওপাশ থেকে বলা ‘খেয়েছিস?’-এ, আবার কখনো কোনো কথা না বলেও পাশে বসে থাকার মধ্যে।
একসময় দূরত্ব বাড়ে, কমে যায় ঝগড়া
সময় খুব নিঃশব্দে মানুষকে বড় করে দেয়। একই ঘরে থাকা ভাই-বোন একসময় আলাদা শহরে চলে যায়। কেউ চাকরির কারণে, কেউ পড়াশোনার জন্য, কেউ সংসারের প্রয়োজনে কিংবা দেশের বাইরে। যে মানুষটির সঙ্গে প্রতিদিন ঝগড়া হতো, তার সঙ্গে তখন কথা হয় সপ্তাহে একবার। কখনো ফোনে মাত্র পাঁচ মিনিট। কখনো ব্যস্ততার কারণে সেই পাঁচ মিনিটও হয়ে ওঠে না।
কিন্তু আশ্চর্য বিষয় হলো, সেই পাঁচ মিনিটের কথাতেই যেন ফিরে আসে শৈশবের বহু বছর। ‘মনে আছে, ছোটবেলায় ওই দিন কী করেছিলি?’- একটি প্রশ্নই মুহূর্তে ফিরিয়ে দিতে পারে পুরোনো দিনের অসংখ্য স্মৃতি। দূরত্ব তখন শুধু শহরের হয় না; জীবনের ব্যস্ততাও সম্পর্কের মাঝে দূরত্ব তৈরি করে। তাই মাঝেমধ্যে করা একটি ফোন, হঠাৎ পাঠানো একটি বার্তা কিংবা পুরোনো কোনো ছবি পাঠিয়ে দেওয়া- এসবই হয়ে ওঠে সম্পর্কটিকে বাঁচিয়ে রাখার ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ সেতু।
অভিমান থাকলেও সম্পর্কটা শেষ হয়ে যায় না
সব বোনের সম্পর্ক সব সময় মসৃণ থাকে না। ভুল বোঝাবুঝি হয়, অভিমান জমে, কখনো অহংকারের কারণে দীর্ঘদিন কথা বন্ধও থাকে। কখনো এমনও হয়, দুজনেই কথা বলতে চান কিন্তু কেউ প্রথমে ফোন করতে পারেন না। অথচ মনের ভেতর দুজনেরই অপেক্ষা থাকে- অন্যজন যদি একবার কথা বলে! সিস্টার্স ডে তাই শুধু আনন্দ করার দিন নয়; এটি সম্পর্কের পুরোনো দরজায় কড়া নাড়ারও একটি উপলক্ষ হতে পারে।
বোন কাছে থাকলে আজ একসঙ্গে বসে চা খেতে পারেন। পুরোনো অ্যালবাম খুলে দেখতে পারেন। শৈশবের কোনো মজার ঘটনা মনে করে হাসতে পারেন।
আর যদি দূরে থাকে? খুব বেশি কিছু করার দরকার নেই। শুধু একটি ফোন করুন। অনেক দিন কথা না হয়ে থাকলে একটি ছোট্ট বার্তা পাঠিয়ে দিন- ‘কেমন আছিস?’
হয়তো এই দুটি শব্দই দীর্ঘদিনের অভিমান ভাঙার প্রথম সেতু হয়ে উঠতে পারে।
‘তুই ছিলি বলেই শৈশবটা সুন্দর ছিল’
জীবনের পথে অনেক মানুষ আসে, আবার হারিয়েও যায়। সময়ের সঙ্গে বাড়ি বদলায়, শহর বদলায়, জীবনযাপন বদলায়। কিন্তু শৈশবের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলো থেকে যায় হৃদয়ের খুব গভীরে।
বোন তেমনই একজন। তার সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে যেমন ঝগড়া আছে, তেমনই আছে গভীর মায়া। আছে অভিমান, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আছে টান। আছে প্রতিযোগিতা, কিন্তু বিপদের সময় সবার আগে পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকারও আছে।
তাই বোন দিবসে বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই। দামি উপহারও নয়। কখনো কখনো একটি আন্তরিক আলিঙ্গন, একটি ফোনকল কিংবা কয়েকটি সত্যিকারের কথা যথেষ্ট।
শুধু একবার তাকে মনে করিয়ে দিন-
‘তুই ছিলি বলেই আমার শৈশবটা এত সুন্দর ছিল।’
হয়তো কথাটি শুনে সে হাসবে, হয়তো বলবে, ‘এত নাটক করিস না!’ কিন্তু বিশ্বাস করুন, কথাগুলো তার মনেও থেকে যাবে- ঠিক যেমন থেকে যায় শৈশবের সেই ছোট্ট ঝগড়াগুলো, যা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অমূল্য স্মৃতিতে পরিণত হয়।



