বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনরবিবার, ২ আগস্ট, ২০২৬
নারী

সন্তানদের সেবা করতে গিয়ে মায়ের মৃ’ত্যু, হাসপাতালের বিছানায় মাকে খুঁজছে দুই শিশু

bandarban_20260801_152029320


বান্দরবান সদর হাসপাতালে হামে আক্রান্ত দুই সন্তানকে সেবা করতে এসে নিজেই অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন লেংরুং ম্রো (২৬)। গত ২৯ জুলাই বাড়ি ফেরার পর তাঁর মৃত্যু হয়। পরদিন পারিবারিকভাবে সম্পন্ন করা হয় তাঁর শেষকৃত্য। অথচ মায়ের মৃত্যুর খবর এখনও জানে না হাসপাতালে চিকিৎসাধীন চার ও দুই বছরের দুই শিশু।

বান্দরবান সদর হাসপাতালের হামে আক্রান্ত রোগীদের জন্য নির্ধারিত আইসোলেশন ওয়ার্ডে পাশাপাশি একই বিছানায় চিকিৎসা নিচ্ছে লেংরুং ম্রোর দুই সন্তান ডং ওয়াই ম্রো (৪) ও কাইং ওয়াই ম্রো (২)। হামে আক্রান্ত হয়ে দুজনই শারীরিকভাবে দুর্বল। জ্বর ও অসুস্থতার ক্লান্তি স্পষ্ট তাদের মুখে। কিন্তু অসুস্থতার মধ্যেও তারা যেন খুঁজে ফিরছে পরিচিত মুখটি। যে মা কয়েক দিন আগেও তাদের পাশে বসে সেবা করেছেন, সেই মা আর কখনো হাসপাতালে ফিরবেন না- এ কথা তারা জানে না।

শিশু দুটির পাশে এখন ছায়ার মতো আছেন তাদের ১৯ বছর বয়সী চাচা ক্রংতং ম্রো। কখনও তিনি ভাইঝির দিকে, কখনও ভাতিজার দিকে তাকাচ্ছেন। চোখের পানি আড়াল করে অসুস্থ দুই শিশুর দেখাশোনা করছেন তিনি। ক্রংতং ম্রো জানান, তাঁদের বাড়ি রুমা উপজেলার দুর্গম গ্যালেংগা ইউনিয়নের চিনিপাড়া গ্রামে। গত ২৬ জুলাই লেংরুং ম্রো সুস্থ অবস্থায় হামে আক্রান্ত দুই সন্তানকে নিয়ে বান্দরবান সদর হাসপাতালে ভর্তি হন। সন্তানদের চিকিৎসা ও সেবা করতে করতে ২৮ জুলাই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারান তিনি।

চিকিৎসকেরা তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু অর্থের অভাবে সেই পরামর্শ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। ক্রংতং বলেন, তাঁর বড় ভাই ক্রংসং ম্রো (২৮) নিরক্ষর এবং বাংলা ভাষায়ও ভালোভাবে কথা বলতে পারেন না। দুই সন্তান তখন হাসপাতালে ভর্তি। পরিবারের হাতে পর্যাপ্ত অর্থও ছিল না। চট্টগ্রামে চিকিৎসার খরচের কথা চিন্তা করে লেংরুংকে সেখানে না নিয়ে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কবিরাজি চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। আর হাসপাতালে থাকা দুই শিশুর দায়িত্ব দেওয়া হয় ক্রংতংয়ের হাতে। তবে শেষ পর্যন্ত লেংরুং ম্রোকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

Advertisements

মায়ের মৃত্যুর পরও হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে দুই শিশু। কখনও কাকার হাত শক্ত করে ধরে, আবার কখনও ওয়ার্ডের দরজার দিকে তাকায় তারা। হয়তো তাদের ছোট্ট মনে এখনও অপেক্ষা- মা বুঝি আবার ফিরে আসবেন, আগের মতো কোলে তুলে নেবেন।

এদিকে স্ত্রীকে হারানোর পর শিশু দুটির বাবা ক্রংসং ম্রোও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে বাড়িতে শয্যাশায়ী। ফলে দুই শিশুর চিকিৎসা, খাবার ও সার্বক্ষণিক দেখাশোনার দায়িত্ব এখন পুরোপুরি তাঁদের চাচা ক্রংতং ম্রোর ওপর। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা রুমার বিভিন্ন স্থানে সম্প্রতি হামের সংক্রমণ উদ্বেগ তৈরি করেছে। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, দারিদ্র্য, সময়মতো চিকিৎসার সুযোগ না পাওয়া এবং টিকাদানের ঘাটতির কারণে ম্রোসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুরা বিশেষভাবে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

বান্দরবান সদর হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে আইসোলেশন ওয়ার্ডে হামে আক্রান্ত ২৪ জন রোগী চিকিৎসাধীন। তাঁদের মধ্যে ১৫ জন শিশু, ছয় জন নারী ও তিন জন পুরুষ। হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) তৌহিদুল আনোয়ার জানান, হামে আক্রান্ত শিশুদের কারও শারীরিক অবস্থা বর্তমানে জটিল নয়। তবে হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত পাঁচজনও চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দুজনের অবস্থা তুলনামূলক জটিল হওয়ায় নিবিড় পর্যবেক্ষণে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

মাকে হারিয়ে অসুস্থ দুই শিশুর সামনে এখন শুধু সুস্থ হয়ে ওঠার লড়াই নয়- অপেক্ষা করছে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎও। যে বয়সে মায়ের হাত ধরে হাসপাতালের বিছানায় থাকার কথা, সেই বয়সেই মায়ের অনুপস্থিতি নিয়েই তাদের শুরু করতে হচ্ছে নতুন এক জীবন।

Advertisements
নারীবান্দরবানশিশুহামহাসপাতাল