বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬
নারী

পানিবন্দি স্বাস্থ্যসেবা, হাওরের নারীদের ভরসা নৌকা আর কোমরপানি

Gemini_Generated_Image_v1n68jv1n68jv1n6

চারদিকে শুধু পানি আর পানি। মাঝখানে কংক্রিটের পিলারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে একটি জরাজীর্ণ ভবন। ভবনের কয়েকটি পিলারের পলেস্তারা খসে পড়েছে, কোথাও কোথাও বের হয়ে গেছে রড। নেই কোনো সংযোগ সড়ক, নেই যাতায়াতের জন্য ঘাট। বর্ষাকালে এই ভবনে পৌঁছানোর একমাত্র ভরসা নৌকা, সাঁতার অথবা কোমরসমান পানি ভেঙে হাঁটা।

এটি কোনো পরিত্যক্ত স্থাপনা নয়; এটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার ভলাকুট ইউনিয়নের খাগালিয়া গ্রামের কমিউনিটি ক্লিনিক। ২০১১ সালে হাওরবেষ্টিত এই গ্রামের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার কথা বিবেচনা করে ক্লিনিকটি নির্মাণ করা হয়। খাগালিয়াসহ আশপাশের চার গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষের চিকিৎসার অন্যতম ভরসা এই প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু নির্মাণের প্রায় ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও ক্লিনিকে যাওয়ার জন্য এখনো কোনো স্থায়ী রাস্তা তৈরি হয়নি।

বর্ষা মৌসুমে হাওরে পানি জমে গেলে চার থেকে পাঁচ মাস ক্লিনিকে যাতায়াত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। তখন মানুষের সেবা দেওয়ার জন্য তৈরি এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিই যেন নিজেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শুকনো মৌসুমে গ্রামের মেঠোপথ ও জমির আইল ধরে মানুষ এখানে আসতে পারলেও বর্ষায় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়।

সম্প্রতি ক্লিনিকের দিকে কোমরপানি ভেঙে যাওয়ার সময় দেখা মেলে ৭৫ বছর বয়সী রূপচাঁন বিবির। খাগালিয়া গ্রামের এই প্রবীণ নারী জানান, গত সপ্তাহে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ নিতে তাকে এই ক্লিনিকে আসতে হয়েছিল। কিন্তু কোমরসমান পানি পেরিয়ে ফেরার পথে পানির নিচে কোনো কিছু কামড় দেয়। এরপর থেকেই তার পা ফুলে গেছে এবং এক সপ্তাহ ধরে তিনি অসুস্থতায় ভুগছেন।

Advertisements

রূপচাঁন বিবি বলেন, ‘ওষুধ নিতে হাসপাতালে আইছিলাম। কিন্তু কোমরসমান পানি ভাইঙা আসতে অইছে। ফেরার সময় পানির নিচে কিছু একটা কামড় দিছে। এরপর থেইক্যা পাও ফুইল্যা গেছে। এখন শরীর ভালো করতে হাসপাতালে আইয়া আমিই অসুস্থ অইয়া গেছি।’

তার মতো একই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে খাগালিয়াসহ আশপাশের চার গ্রামের বাসিন্দাদের। বর্ষার সময় চিকিৎসা নিতে আসা অনেকের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় পানি পেরিয়ে ক্লিনিকে পৌঁছানো।

খাগালিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকে ২২ ধরনের প্রাথমিক ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়। এখানে প্রতিদিন একজন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) দায়িত্ব পালন করেন। সপ্তাহে এক দিন পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকাও সেবা দেন। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৮০ জন রোগী চিকিৎসা নিতে এলেও বর্ষাকালে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১০ থেকে ২০ জনে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, সাপের ভয়, পানির স্রোত এবং যাতায়াতের অনিশ্চয়তার কারণে অনেকেই প্রয়োজন হলেও ক্লিনিকে আসতে সাহস পান না।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল বারেক বলেন, কয়েক দিন আগে তিনি তার নাতিকে নিয়ে ক্লিনিকে গিয়েছিলেন। সেখানে টেবিলের নিচে প্রায় এক হাত লম্বা একটি সাপ দেখতে পান। আতঙ্কে শেষ পর্যন্ত ওষুধ না নিয়েই ফিরে আসতে হয়েছে তাকে।

আমেনা বেগম নামের এক নারী জানান, বর্ষার সময় দীর্ঘদিন ক্লিনিকটি পানির মধ্যে ডুবে থাকে। নারীদের জন্য এ অবস্থায় পানি পেরিয়ে বাইরে বের হওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে। তার দুই সন্তান জ্বরে ভুগলেও পানির কারণে তিনি তাদের নিয়ে চিকিৎসার জন্য যেতে পারছেন না।

যাতায়াত ব্যবস্থার অভাবে শুধু সাধারণ রোগীরাই নয়, জরুরি রোগীদেরও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। গত বছর বর্ষাকালে খাগালিয়া গ্রামের রাফিয়া বেগমের (২৫) প্রসব বেদনা উঠলে তাকে মাঝরাতে নৌকায় করে উপজেলা সদরে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। পথে নৌকা ডুবে যাওয়ার উপক্রম হলে বড় ধরনের বিপদের মুখে পড়েন তিনি। শেষ পর্যন্ত মা ও শিশু দুজনই বেঁচে গেলেও সেই আতঙ্ক এখনো কাটেনি গ্রামবাসীর।

স্থানীয়দের মতে, এই কমিউনিটি ক্লিনিকটি যদি সঠিকভাবে চালু রাখা সম্ভব হয়, তাহলে তাদের প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হবে না।

জরাজীর্ণ ভবন, আতঙ্কে স্বাস্থ্যকর্মীরাও

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ক্লিনিক ভবনের ছাদ দিয়ে পানি পড়ছে। ভেতরে ঢুকতেই কয়েকটি ইঁদুর ছুটে পালাতে দেখা যায়। সকাল থেকে কয়েকজন নারী কোমরপানি পেরিয়ে ক্লিনিকে আসেন, আবার কেউ কেউ নৌকায় করে পৌঁছান।

ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) মো. আরিফ রহমান বলেন, অনেক সময় নৌকা পাওয়া যায়, আবার অনেক সময় পাওয়া যায় না। নৌকা না পেলে সাঁতরে ক্লিনিকে আসতে হয়। ক্লিনিকে প্রবেশের আগে লাঠি দিয়ে মেঝেতে শব্দ করতে হয়, যাতে ভেতরে থাকা সাপ সরে যায়।

তিনি আরও বলেন, ভবনটির অবস্থাও ঝুঁকিপূর্ণ। কয়েকটি পিলারে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং সেখান থেকে রড বের হয়ে গেছে। ছাদ দিয়ে পানি পড়ায় ওষুধ ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নষ্ট হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপদ পরিবেশে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

জানা যায়, ১৯৯৮ সালে এই অঞ্চলের মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেয় সরকার। পরে ২০১১ সালে স্থানীয় এক ব্যক্তির দান করা নিচু জমিতে কমিউনিটি ক্লিনিক ভবনটি নির্মাণ করা হয়। তবে প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সময় পার হলেও এখনো ক্লিনিকে যাওয়ার জন্য কোনো স্থায়ী সড়ক নির্মাণ হয়নি।

ভলাকুট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রুবেল মিয়া বলেন, ক্লিনিকের রাস্তা নির্মাণের জন্য একাধিকবার প্রকল্প নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে জায়গাটি নিচু হওয়ায় ইউনিয়ন পরিষদের সীমিত বাজেট দিয়ে কাজটি সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না।

নাসিরনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. শফিকুল ইসলাম বলেন, খাগালিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের ভৌগোলিক অবস্থান বেশ প্রতিকূল। বর্ষাকালে মানুষের যাতায়াতের সমস্যা বিবেচনা করে সেখানে একটি উঁচু পথ নির্মাণ এবং ভবনটি আরও উঁচু করে পুনর্নির্মাণের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে আপাতত সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই স্বাস্থ্যকর্মীরা সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

সূত্রঃ সমকাল

Advertisements
নারীপানিবন্দিস্বাস্থ্যসেবা