‘কবুল’ ছাড়াও যেসব শব্দে সহিহ হয় নিকাহ

ইসলামে বিয়ে একটি পবিত্র ও বৈধ বন্ধন, যার মাধ্যমে একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও পুরুষের মধ্যে দাম্পত্য সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সম্পর্ক মানুষকে শরিয়তের বিধান মেনে জীবনযাপন করতে সহায়তা করে এবং হারাম ও গুনাহ থেকে দূরে থাকার সুযোগ করে দেয়।
বিয়ে সম্পর্কে ইসলামে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি বিয়ে করল, সে তার অর্ধেক দ্বীন পূর্ণ করল। অতএব, বাকি অর্ধেকের ব্যাপারে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে।’ (বায়হাকি, শুআবুল ইমান)

আরেক হাদিসে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি বিয়ের দায়িত্ব পালনে সক্ষম, সে যেন বিয়ে করে। কারণ, বিয়ে দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। আর যে ব্যক্তি বিয়ের সামর্থ্য রাখে না, সে যেন রোজা রাখে। কেননা রোজা তার প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
ফিকহে হানাফি অনুযায়ী, নিকাহ সম্পন্ন হওয়ার জন্য ‘ইজাব’ (প্রস্তাব) ও ‘কবুল’ (গ্রহণ) অপরিহার্য। তবে এর অর্থ এই নয় যে, কেবল ‘কবুল’ শব্দ উচ্চারণ করলেই নিকাহ বৈধ হবে কিংবা অন্য কোনো শব্দ ব্যবহার করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। বরং এমন যেকোনো স্পষ্ট শব্দ বা বাক্য, যা বিয়ের প্রস্তাব গ্রহণের অর্থ পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করে, তার মাধ্যমেও নিকাহ শুদ্ধভাবে সম্পন্ন হতে পারে।
নিকাহ সহিহ হওয়ার মৌলিক শর্ত
ফিকহ অনুযায়ী নিকাহ বৈধ হওয়ার জন্য কয়েকটি মৌলিক শর্ত পূরণ করতে হয়।
প্রথমত, এক পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে বিয়ের প্রস্তাব বা ‘ইজাব’ থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, অপর পক্ষকে সেই প্রস্তাব সুস্পষ্টভাবে গ্রহণ বা ‘কবুল’ করতে হবে।
তৃতীয়ত, এমন শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করতে হবে, যার মাধ্যমে নিকাহের অর্থ দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রকাশ পায়।
চতুর্থত, নিকাহের সময় দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষ সাক্ষী অথবা একজন মুসলিম পুরুষ ও দুজন মুসলিম নারী সাক্ষীর উপস্থিতি থাকতে হবে।

‘কবুল’ ছাড়াও যেসব শব্দে নিকাহ সম্পন্ন হতে পারে
১. قَبِلْتُ (ক্ববিলতু)
এর অর্থ, ‘আমি গ্রহণ করলাম।’ ইজাবের জবাবে বর বা কনে যদি ‘قَبِلْتُ’ উচ্চারণ করেন, তাহলে সেটি পূর্ণাঙ্গ কবুল হিসেবে গণ্য হবে এবং নিকাহ শুদ্ধ হবে।
২. رَضِيتُ (রদ্বিতু)
এর অর্থ, ‘আমি রাজি হলাম’ অথবা ‘আমি সন্তুষ্ট হলাম।’ বিয়ের প্রস্তাবের পর এই শব্দ উচ্চারণ করলেও তা সম্মতির সুস্পষ্ট প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং নিকাহ সম্পন্ন হবে।
৩. تَزَوَّجْتُهَا (তাজাওয়াজ্জাতুহা)
এর অর্থ, ‘আমি তাকে বিবাহ করলাম।’ বর যদি এই বাক্যের মাধ্যমে নিজের সম্মতি প্রকাশ করেন, তাহলে সেটিও নিকাহ গ্রহণের স্পষ্ট ভাষা হিসেবে গণ্য হবে।
৪. أَنْكَحْتُ نَفْسِي إِيَّاهُ (আনকাহতু নাফসি ইয়্যাহু)
এর অর্থ, ‘আমি নিজেকে তার সঙ্গে বিবাহ করলাম।’ এই বাক্যও বিয়ের সম্মতি ও বৈবাহিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার অর্থ স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে।
৫. أَجَزْتُهُ (আজাযতুহু)
এর অর্থ, ‘আমি এটি অনুমোদন করলাম।’ যদি কোনো প্রতিনিধি বা ওকিলের মাধ্যমে ইজাব সম্পন্ন হয়, এরপর মূল ব্যক্তি এই শব্দ ব্যবহার করে অনুমোদন দেন, তাহলে সেই নিকাহও সহিহ হবে।
ফিকহি গ্রন্থে যা বলা হয়েছে
১. আল-ফাতাওয়াল হিন্দিয়্যাহ (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া)
ويجوز النكاح بألفاظ هي صريحة في النكاح، كأنكحت، وتزوجت، وقبلت، ورضيت، ونحوها
বাংলা অর্থ: নিকাহ এমন সব স্পষ্ট শব্দের মাধ্যমে বৈধ হয়, যেমন—أنكحتُ، تزوجتُ، قبلتُ، رضيتُ এবং এ ধরনের অন্যান্য শব্দ।
২. আল-হিদায়াহ
ويعتبر الإيجاب والقبول بلفظ يدل عليه صريحاً
বাংলা অর্থ: ইজাব ও কবুল এমন শব্দে হতে হবে, যা স্পষ্টভাবে নিকাহের অর্থ প্রকাশ করে।
৩. আদ-দুররুল মুখতার মাআ রদ্দুল মুহতার (ফতোয়ায়ে শামী)
ويصح النكاح بكل لفظ صريح يدل على التمليك في الحال، كزوجتك، أنكحتك، وتزوجت ونحوها
বাংলা অর্থ: এমন প্রত্যেকটি সুস্পষ্ট শব্দ, যা তাৎক্ষণিকভাবে বৈবাহিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার অর্থ প্রকাশ করে, তার মাধ্যমে নিকাহ সহিহ হয়। যেমন—زوجتك، أنكحتك، تزوجت এবং এ ধরনের অন্যান্য শব্দ।

কোরআনের দৃষ্টান্ত
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
فَإِمْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ
অর্থ: ‘অতঃপর হয় ভদ্রভাবে স্ত্রীকে রেখে দাও, অথবা সম্মানের সঙ্গে তাকে বিদায় দাও।’ (সূরা আল-বাকারা: ২২৯)
এই আয়াতে إِمْسَاكٌ শব্দের মাধ্যমে বৈবাহিক সম্পর্ক বজায় রাখার সম্মতি ও স্বীকৃতির বিষয়টি প্রকাশ করা হয়েছে, যা কবুলের মূল তাৎপর্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
হাদিসের দৃষ্টান্ত
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
النكاح عن تراض
অর্থ: ‘নিকাহ পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়।’ (সুনান ইবনু মাজাহ)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, নিকাহের ক্ষেত্রে শুধু ‘কবুল’ শব্দ উচ্চারণ করাই একমাত্র শর্ত নয়। বরং উভয় পক্ষের সম্মতি সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পেলেই নিকাহ সম্পন্ন হতে পারে।
ফিকহে হানাফির আলোকে বলা যায়, ‘কবুল’ শব্দের পরিবর্তে এমন যেকোনো শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করা বৈধ, যা স্পষ্টভাবে বিয়ের সম্মতি এবং বৈবাহিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার অর্থ প্রকাশ করে। তবে এ ক্ষেত্রে সাক্ষীদের উপস্থিতি, সঠিক প্রেক্ষাপট এবং বক্তব্যের সুস্পষ্টতা নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
তবে শরিয়তে বিকল্প শব্দ ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও ভবিষ্যতে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি বা বিরোধ এড়াতে অধিকাংশ ফকিহ প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ‘আমি কবুল করলাম’ বলেই নিকাহ সম্পন্ন করাকে অধিক উত্তম ও নিরাপদ পদ্ধতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।



