একমাত্র সন্তান মানেই কি স্বার্থপর? এই ধারণা কতটা সত্য?

“একটা সন্তান? আর নেবেন না?”- বাংলাদেশের অনেক পরিবারেই এই প্রশ্ন শুনতে হয়। আর যদি জানা যায়, পরিবারে একটি মাত্র সন্তান, তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই আরেকটি মন্তব্যও জুড়ে যায়, “একমাত্র সন্তানরা একটু স্বার্থপর হয়। সবকিছু নিজের মতো চায়।”
কিন্তু এই ধারণার পেছনে কি সত্যিই কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে, নাকি এটি শুধু সমাজে প্রচলিত একটি ধারণা? মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, একজন শিশুর ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে শুধু ভাই-বোন আছে কি নেই, তার ওপর নয়; বরং পরিবার, লালন-পালন, সামাজিক পরিবেশ এবং অভিজ্ঞতার সম্মিলিত প্রভাবে।
ধারণার জন্ম কোথায়?
অনেকেই মনে করেন, একমাত্র সন্তান পরিবারের সব মনোযোগ, সময় ও সম্পদ একাই পায়। ফলে সে ভাগাভাগি শেখে না, নিজের ইচ্ছাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। এই পর্যবেক্ষণ থেকেই “একমাত্র সন্তান মানেই স্বার্থপর” ধারণাটি তৈরি হয়েছে।
কিন্তু বাস্তবতা এতটা সরল নয়। গবেষণা কী বলছে?
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, একমাত্র সন্তানদের মধ্যে স্বার্থপরতা অন্যদের তুলনায় বেশি- এমন প্রমাণ স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়নি। বরং তারা অনেক ক্ষেত্রেই আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল এবং প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ করতে পারে।
অবশ্য কিছু একমাত্র সন্তান ব্যক্তিগত সময় বেশি পছন্দ করতে পারে বা স্বাধীনভাবে কাজ করতে অভ্যস্ত হতে পারে। কিন্তু সেটিকে স্বার্থপরতা বলা ঠিক নয়।
তাহলে কেন এমন ধারণা তৈরি হয়?
অনেক সময় একমাত্র সন্তানকে পরিবার অতিরিক্ত সুরক্ষা দেয়। তার প্রতিটি চাওয়া দ্রুত পূরণ করা হয়। যদি শিশুকে সীমা, নিয়ম ও অন্যের অনুভূতির মূল্য শেখানো না হয়, তাহলে সে আত্মকেন্দ্রিক আচরণ করতে পারে। তবে একই বিষয় একাধিক সন্তানের পরিবারেও ঘটতে পারে। অর্থাৎ সমস্যা সন্তানসংখ্যায় নয়, বরং লালন-পালনের ধরনে।
ভাই-বোন না থাকলে কী শেখে না?
ভাগাভাগি, সহযোগিতা বা অপেক্ষা করার মতো দক্ষতা শুধু ভাই-বোনের কাছ থেকেই শেখা যায় না। স্কুল, বন্ধু, খেলার মাঠ, আত্মীয়স্বজন কিংবা দলগত কার্যক্রম থেকেও শিশু এসব সামাজিক দক্ষতা অর্জন করতে পারে।
অন্যদিকে, ভাই-বোন থাকা সত্ত্বেও কেউ যদি সবসময় নিজের কথাই ভাবে, তাহলে তাকেও আত্মকেন্দ্রিক বলা যায়। তাই ভাই-বোন থাকাই ভালো সামাজিক আচরণের নিশ্চয়তা নয়।
অভিভাবকদের করণীয়:
যদি আপনার একমাত্র সন্তান থাকে, তাহলে কিছু বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখুন—
-ছোটবেলা থেকেই ভাগাভাগি করার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
অন্যের অনুভূতি বুঝতে শেখান।
-সব চাওয়া সঙ্গে সঙ্গে পূরণ না করে অপেক্ষা করতে শেখান।
-দলগত খেলাধুলা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে উৎসাহ দিন।
-নিজের কাজ নিজে করার অভ্যাস তৈরি করুন।
-পরিবারের সিদ্ধান্তে সন্তানের মতামত নিন, তবে সব সিদ্ধান্ত তার ইচ্ছামতো না নেওয়াই ভালো।
একজন মানুষ স্বার্থপর হবে কি না, তা নির্ধারণ করে না সে একমাত্র সন্তান কি না। বরং তার মূল্যবোধ, পারিবারিক শিক্ষা, সামাজিক অভিজ্ঞতা এবং অভিভাবকের আচরণই ব্যক্তিত্ব গঠনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে।
তাই একমাত্র সন্তানকে দেখে “ও তো স্বার্থপর হবেই”- এমন মন্তব্য করার আগে মনে রাখা জরুরি, প্রতিটি শিশুই আলাদা। ভালোবাসা, নিয়ম, সহমর্মিতা এবং সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে একমাত্র সন্তানও বড় হতে পারে একজন দায়িত্বশীল, উদার ও সামাজিক মানুষ হিসেবে।



