Skip to content

১৮ই আগস্ট, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | বৃহস্পতিবার | ৩রা ভাদ্র, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

রাইন নদীর তীরের এক শহর

ইউরোপের রাইন নদী অসংখ্য ইতিহাসের সাক্ষী। বিখ্যাত এই নদী গল্প, উপন্যাস এমনকি ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য অনেক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে আছে। সেইসকল ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ার দরুন রাইনের পাড়ে গড়ে উঠেছে নগর, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের স্মারকচিহ্ন। এই রাইন নদী ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী। সুইজারল্যান্ডের আল্পস থেকে জন্ম নিয়ে জার্মানি, নেদারল্যান্ডের কোল ছুঁয়ে মিশেছে সেই উত্তর মহাসাগরে। আর এই দীর্ঘ পরিযাত্রায় কাছাকাছি থাকা দেশগুলোকে প্রাণবন্ত রেখেছে।

নদী ও মানুষের মাঝে গভীর মিতালি! এই নদীর কাঁখেই বেড়ে উঠতে থাকা জনপদ তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বুনিয়াদের জন্যে রাইনের উপর নির্ভরশীল ছিল। এমনকি শিল্প-সাহিত্যেও রাইনের অবদান কখনই ভুলে যাওয়া হয়নি। আর এই ঐতিহাসিক নদীর পাড়েই গড়ে উঠেছে কেহল শহর। ভ্রমণের জন্যে এরচেয়ে সুন্দর জায়গা পাওয়া সম্ভবত মুশকিল। কিন্তু তার আগে আসুন জেনে নেই রাইন ও কেহলের ইতিহাস।

কেহল মূলত দক্ষিণ-পশ্চিম জার্মানির এক প্রান্তিক জনপদ। মূলত সুইজারল্যান্ড থেকে রাইন নদী নেমে এসে রাইন নদী উত্তরবাহী হয়ে ওঠে। এই রাইন নদীই জার্মানি ও ফ্রান্সকে দ্বিখণ্ডিত করেছে। রাইন নদীর তীরবর্তী কেহল জনপদ এই জলাধারকে কেন্দ্র করেই বিবর্তিত হয়েছে।

বিশেষত কেহলের পশ্চিমপ্রান্তের দিকে অর্থাৎ ১১ নদীটি পার করলেও ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গ শহর। এই নদীর পূর্বদিকে বিশাল ও বিস্তৃত ‘ব্ল্যাক ফরেস্ট’। রাইনের দক্ষিণে সুইজারল্যান্ড ও উত্তরে জার্মানির রাজধানী বার্লিন। তাই কেহলের দুইপাশেই নদী ও একপাশে বনভূমি। একপাশের বনভূমিকে খুব ভয়ংকর কিছু ভাবার প্রয়োজন নেই। ‘ব্ল্যাক ফরেস্ট’ অনেকটা পর্বতের মতো। এছাড়াও ঘন বনের মিশেলে বেলে পাথরের এই বনপর্বত কেহলকে যেন সুরক্ষিত করে রেখেছে।

এখান থেকেই কেহলের ইতিহাস শুরু। আপনি যখন জার্মানি ঘুরতে আসবেন, তখন এই কেহলের চারপাশের সবকিছুই যেন ইতিহাসের স্মারকলিপি হয়ে থাকবে। ‘ব্ল্যাক ফরেস্ট’-কে কালো বলার কোনো কারণ নেই। চোখ-জুড়ানো সবুজ অনেক সাজানো গোছানো। অবশ্য আপনি গাড়িতে চড়েও এই সবুজের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। একটু দূর থেকে এই বনরাজিকে কিছুটা কালো দেখায়। তবে অনেকের ধারণা, রোমানরা এই বনের নামকরণ করেছিল কারণ একসময় এই অঞ্চল দুর্ভেদ্য ও অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল।

এবার কেহলের ইতিহাসের দিকেই ফেরা যাক। খ্রিষ্টীয় একাদশ শতকে রাইনের তীরবর্তী কেহল শহরে ছিল জেলেদের বাস। তাই একে জেলেবস্তি হিসেবেই সবাই চেনে। এমনকি চৌদ্দশ শতকের প্রথমার্ধে সমগ্র ইউরোপেই এটি জেলেদের অঞ্চল বলে পরিচিত ছিল। কিন্তু এখন এটি একটি বিশাল শহর। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া সত্ত্বেও উন্মুক্ত প্রকৃতি এই শহরকে আরো সুন্দর করে তুলেছে।

এখনো প্রকৃতি এখানে যথেষ্ট আদরের। গ্রামের আছে নিজস্ব পরিসর। মজার ব্যাপার হলো, বাংলায় একে বলা চলে ‘ধরা গলা’। জার্মান ভাষায় কেহলা শব্দের অর্থ ‘গলা’। ভাষার যে গ্রামীণ বিবর্তন তার ফলে এই নাম হয়েছে ‘কেহল’। এই নামের পেছনে অবশ্য এক প্রাচীন জনশ্রুতি আছে। তখনকার সময়ে এই জেলেপাড়ার কিছু কিছু মানুষের ছিল ‘থ্রোটি ভয়েস’। এজন্যেই তাদের কেহল বলা থেকেই শহরের নামও এমন হয়ে গেলো। এখনো এই শহরে কেহল পদবীর অনেক মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে।

রাইন নদীর পাড়ে থাকা এই জনপদ বহু ইতিহাসের সাক্ষী – হতে হয়েছে বিপর্যস্ত। সতেরশো শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর কেহল দখল করেন। মূলত স্ট্রাসবুর্গকে সুরক্ষিত রাখতেই তিনি সেখানে একটি দুর্গ নির্মাণ করেন। তবে ওই শতকেই জার্মানি ও ফ্রান্সের মধ্যে ‘রিসুইক’ শান্তি চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর জার্মানরা কেহল ফিরে পায়। আঠারো শতকের দিকে জার্মানরা মূলত প্রশাসনিক ক্ষেত্রে সুবিধার লক্ষ্যে ছোট ছোট নগরকে একত্রীত করতে শুরু করেন। ঐ সময়ে কেহল বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং ইউরোপের একটি নগর হিসেবে মর্যাদা পায়।

অবশ্য পরবর্তী বহুবার কেহল জার্মানদের হাতছাড়া হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় কেহলের যুদ্ধে এই নগর বহুবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মূলত উনিশ শতকেই ‘প্যারিস চুক্তির’ মাধ্যমে কেহল আবার জার্মানদের হাতে ফিরে আসে। মূলত কেহলের দুর্গটিকে ভেঙেই আবার শহরকে ঢালাও করে সাজানোর কাজ শুরু হয়।

কেহল কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? এটি মূলত জার্মানি থেকে ফ্রান্সে প্রবেশের সদর দরজা। রাইন নদীর উপরেই তিনটি সেতু পাওয়া যাবে। এই তিন সেতু কেহল আর স্ট্রাটসবুর্গকে সংযুক্ত করেছে। উত্তর দিকের সেতুটি দিয়ে শুধু ট্রেন চলাচল করে। দক্ষিণের সেতু দিয়ে ট্রাম ছুটে চলে। এমনকি তার দুইপাশে হাটার জন্যে রাস্তা এবং গাড়ি চলাচলের সুবিধা আছে। আরো দক্ষিণে আছে আরেকটা সেতু। সেটিতে অবশ্য শুধু পায়ে হেটে চলাচল করা যায়। পায়ে হেটেই আপনি জার্মানি পার হয়ে চলে যাবেন ফ্রান্সে।

বিষয়টি মজার না? কেহলে ঘুরতে এসেই আপনি একসাথে দুটো দেশের মাঝে যাতায়াত করতে পারবেন। সেতুর মাঝখানে আড্ডার জায়গা আছে। এই জায়গা না ফ্রান্সের; না জার্মানির। সেতুর রেলিঙে বহু তালা দেখতে পাবেন। স্থানীয় মানুষের ধারণা তালা ঝুলিয়ে রাখলে মনস্কামনা পূর্ণ হয়। বিশেষত প্রেমিকযুগলেরা মনে করে তালা ঝুলিয়ে চাবি রাইনের নদীতে ভাসিয়ে দিলে সম্পর্ক টিকে থাকবে। রাইনের তীরে হই-হুল্লোড় আর প্রেমের সুর আপনাকে প্রাণবন্ত রাখবে।

কেহল মাত্র ৭৫ বর্গ কিলোমিটারের নগর। এর জনবসতি ৩৬ হাজারের মতো। ফ্রান্স দ্বারা অধিকৃত হওয়ার আগে এখানকার মানুষ প্রোট্যাস্ট্যান্ট হলেও পরবর্তীতে ক্যাথলিক হয়ে ওঠে। শহরে বিনোদনের জন্যে পার্ক, থিয়েটার হল, নাইটবার ও অন্যান্য অনেক সুবিধা আছে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা স্কুল, টেনিস্কোর্ট আর ফুটবল মাঠ অন্তত আপনাকে বাংলাদেশে মাঠ না থাকার আফসোসে পোড়াবে। বন্দরনগরী হওয়ায় বাজারদর বেশ কম।

এই শহরে কার্নিভালের বেশ গুরুত্ব আছে। আপনি যদি কোনো উৎসবের সময় চান তাহলে বসন্তের আগে আগে গেলে উপভোগ করবেন। প্রাচীন বিশ্বাস অনুযায়ী, শীত শয়তানের রাজত্ব। তাই শীতের একদম শেষে আসাই কার্নিভাল বসন্তকে বরণ করে। নগরবাসীরা অদ্ভুত পোশাক ও মুখোশ পরে শোভাযাত্রায় বের হয়। এসময় গানবাজনাও চলে। ভায়োলিনের সুর, মানুষের কোলাহল এই উৎসবকে যেন অনাদিকালে নিয়ে চলে।

এমনিতে কেহল বেশ শান্ত শহর। আপনি যদি কেহল ঘুরতে যান, তাহলে অসংখ্য যুদ্ধ-চিহ্ন দেখতে পাবেন। রাইন্সট্রব চত্বরে গেলেই ১৮৭০ সালের ফ্রান্স-জার্মানি যুদ্ধের স্মারক দেখতে পাওয়া যাবে। এছাড়া পাবেন মাতা কিনযিগের মূর্তি। মাতা কিনযিগের মূর্তির অপরদিকেই আছে শান্তি গির্জা – ফ্রিডেনস কিসা। ১৮১৭ সালে নির্মিত এই গির্জা ক্যাথলিক বা প্রোটেস্ট্যান্ট – উভয়েরই প্রার্থনাস্থল। দক্ষিণের দিকে হাই স্কুলের পাশে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত ২১৪৪ জার্মান সৈন্যের মৃতদেহ নীরবে শায়িত। যুদ্ধের ভয়াবহতার চিহ্ন।

যুদ্ধের সময় কমান্ডারদের জন্যে নির্মিত বহুতল ভবনটিই এখন কেহলের টাউন হল। এই শহরের প্রতিটি স্থাপনাই আপনাকে কিছুটা অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। রাইন নদীকে জড়িয়ে থাকা এই নগর হয়তো চোখ ধাঁধানো কিছুই দেখাবে না। কিন্তু এর প্রতিটি অংশই আপনায় মুগ্ধ করবে। বিশেষত ইতিহাসের স্মারকের মাঝে ঘুরতে ফিরতে বহুবার দেখা পাবেন গল্পের।

অনন্যা/এআই