বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬
বিবিধ

গতি কমিয়ে চলছে মেট্রো রেল, ১০ স্থানে স্পিড রেস্ট্রিকশন

গতি কমিয়ে চলছে মেট্রো রেল, ১০ স্থানে স্পিড রেস্ট্রিকশন

রাজধানীর উত্তরা উত্তর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত চলাচলকারী এমআরটি লাইন-৬ মেট্রো রেলে বড় ধরনের কাঠামোগত ও পরিচালনগত ত্রুটি শনাক্ত হয়েছে। স্বাধীন নিরাপত্তা অডিট কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রুটজুড়ে ব্যবহৃত বেয়ারিং প্যাডের ২৩.২৮ শতাংশ, অর্থাৎ ৭৩০টি ত্রুটিপূর্ণ। একই সঙ্গে ৪৬টি পিয়ার হেড এবং অন্তত ২০টি বক্স গার্ডারে ফাটল পাওয়া গেছে। এসব ত্রুটির কারণে বর্তমানে ১০টি স্থানে ট্রেনের গতি কমিয়ে চালানো হচ্ছে এবং আন্ডারশুটিং সমস্যার কারণে পাঁচটি ট্রেনসেট রাজস্বভিত্তিক পরিচালনা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, পুরো মেট্রো রেল ব্যবস্থায় এখনো কোনো কার্যকর রিয়াল-টাইম স্ট্রাকচারাল হেলথ মনিটরিং (এসএইচএম) ব্যবস্থা চালু হয়নি। ফলে পিলারে ফাটল, বেয়ারিং প্যাডের স্থানচ্যুতি, ট্র্যাক বসে যাওয়া কিংবা অস্বাভাবিক কম্পনের মতো বিষয়গুলো তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।

স্বাধীন নিরাপত্তা অডিট কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ত্রুটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং এগুলো সম্মিলিতভাবে একটি ‘যৌগিক ঝুঁকি প্রোফাইল’ তৈরি করেছে, যা যাত্রী নিরাপত্তা এবং অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের জন্য উদ্বেগজনক।

কমিটির ধারণা, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, নির্মাণত্রুটি কিংবা নকশাগত দুর্বলতা—সবই এসব সমস্যার সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত ত্রুটির প্রকৃত কারণ নির্ধারণ কিংবা পূর্ণাঙ্গ প্রতিস্থাপন কর্মসূচির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

Advertisements

উল্লেখ্য, গত বছরের ২৬ অক্টোবর ফার্মগেট এলাকায় একটি বেয়ারিং প্যাড নিচে পড়ে একজন পথচারীর মৃত্যুর ঘটনার পর হাইকোর্ট ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) নয় সদস্যের একটি স্বাধীন নিরাপত্তা অডিট কমিটি গঠন করে। চুয়েটের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি চলতি বছরের মে মাসে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।

অডিট প্রতিবেদনে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে বেয়ারিং প্যাডের অবস্থা। বেয়ারিং প্যাড মেট্রো রেলের উড়াল কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা ট্রেনের ওজন ও কম্পনের চাপ পিলারে স্থানান্তর করে। এই উপাদানে ত্রুটি দেখা দিলে পুরো উড়াল কাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

পরিদর্শনে দেখা গেছে, ৭৩০টি বেয়ারিং প্যাডে বিভিন্ন ধরনের ত্রুটি রয়েছে। বিশেষ করে ৪৪২, ৪৪৬ ও ৪৪৮ নম্বর পিয়ারে ট্রেন চলাচলের সময় বেয়ারিং প্যাডে অস্বাভাবিক ধাক্কার ঘটনা লক্ষ্য করা হয়েছে। এছাড়া ৪২৩ নম্বর পিয়ারে একটি বেয়ারিং প্যাড স্থানচ্যুত হওয়ার ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।

শুধু বেয়ারিং প্যাড নয়, ৪৬টি পিয়ার হেড এবং অন্তত ২০টি বক্স গার্ডারেও ফাটল শনাক্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও কংক্রিট খসে পড়ার ঘটনাও ধরা পড়েছে। বিশেষ করে ৩৪১ নম্বর পিয়ারের ফাটল নিরাপদ সীমা অতিক্রম করায় সেটিকে উচ্চ ঝুঁকির তালিকায় রাখা হয়েছে।

কমিটির পর্যবেক্ষণে আরও উঠে এসেছে, এসব ফাটলের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, ক্র্যাক গেজ স্থাপন কিংবা অনুমোদিত প্রকৌশল পদ্ধতিতে মেরামতের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাদের মতে, এ ধরনের অবহেলা ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের কাঠামোগত ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অস্বাভাবিক কম্পন, ঝাঁকুনি, ট্র্যাকের ত্রুটি এবং বেয়ারিং প্যাডের সমস্যার কারণে যাত্রীদের ভ্রমণস্বাচ্ছন্দ্যও উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মূল নকশা অনুযায়ী ট্রেনের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে ১০টি অংশে টেম্পোরারি স্পিড রেস্ট্রিকশন (টিএসআর) কার্যকর রয়েছে। এসব স্থানে ট্রেন ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৯০ কিলোমিটার গতিতে চলাচল করছে। কোনো কোনো অংশে গতি নেমে আসছে মাত্র ৪৪ থেকে ৪৭ কিলোমিটার পর্যন্ত।

কমিটির মতে, মূল সমস্যার সমাধান না করে শুধু গতি কমিয়ে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর সমাধান নয়।

পরিচালনাগত সমস্যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ট্রেনের আন্ডারশুটিং। অস্বাভাবিক ব্রেকিংয়ের কারণে ট্রেন নির্ধারিত স্টপিং পয়েন্টের আগেই থেমে যাচ্ছে। ফলে ট্রেনের দরজা এবং প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোরের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে, যা যাত্রীদের পড়ে যাওয়া কিংবা আটকে পড়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

এই সমস্যার কারণে ইতোমধ্যে পাঁচটি ট্রেনসেট রাজস্বভিত্তিক পরিচালনা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এছাড়া ট্রেনের চাকার অস্বাভাবিক ক্ষয়, সম্ভাব্য ফাটল, দরজা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ত্রুটি এবং ওভারহেড ক্যাটেনারি সিস্টেমে ধারাবাহিক বৈদ্যুতিক স্পার্কিংকেও বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে অডিট কমিটি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে ডিপো এলাকায় ট্র্যাক বসে যাওয়ার সমস্যা অব্যাহত রয়েছে। নিয়মিত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

অডিটে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি হলো, পুরো মেট্রো রেল ব্যবস্থায় এখনো কোনো কার্যকর রিয়াল-টাইম স্ট্রাকচারাল হেলথ মনিটরিং ব্যবস্থা নেই। ফলে কাঠামোর বিভিন্ন অংশে উদ্ভূত ত্রুটি তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত ও মূল্যায়নের সুযোগ সীমিত রয়েছে।

এ বিষয়ে অডিট কমিটির সদস্য এবং বুয়েটের অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, বর্তমানে বেয়ারিং প্যাডে ব্র্যাকেট স্থাপন, গতি কমিয়ে ট্রেন পরিচালনা কিংবা অতিরিক্ত রক্ষণাবেক্ষণের মতো পদক্ষেপগুলো মূলত সাময়িক ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা। এগুলো কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।

তিনি জানান, কমিটি জরুরি ভিত্তিতে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বেয়ারিং প্যাড প্রতিস্থাপন, ফাটল পর্যবেক্ষণের জন্য ক্র্যাক গেজ স্থাপন, পূর্ণাঙ্গ ডাইনামিক ভাইব্রেশন পরীক্ষা, ট্র্যাক ও বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার ত্রুটি দূরীকরণ এবং আন্তর্জাতিক মানের স্বাধীন নিরাপত্তা পর্যালোচনার সুপারিশ করেছে।

একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে স্মার্ট স্ট্রাকচারাল হেলথ মনিটরিং ব্যবস্থা চালু, ডিজিটাল ত্রুটি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং একটি স্বাধীন সেফটি স্টিয়ারিং কমিটি গঠনেরও আহ্বান জানিয়েছে নিরাপত্তা অডিট কমিটি।

Advertisements
এমআরটিমেট্রো রেললাইন-৬স্পিড