না ফেরার দেশে চলে গেলেন বন্যপ্রাণীপ্রেমী সিতেশ রঞ্জন দেব

আর কারও ফোনে সাড়া দেবেন না এই মানুষটি। উদ্ধার করবেন না কোনো বন্যপ্রাণী। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন সবার পরিচিত ‘সিতেশ বাবু’। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সকালে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে নেওয়ার পথে পরলোক গমন করেন সিতেশ রঞ্জন দেব। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। মঙ্গলবার দুপুরে শ্রীমঙ্গল উপজেলার নোয়াগ্রামে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে।
সিতেশ রঞ্জন দেব, যিনি মানুষের কাছে ‘সিতেশ বাবু’ নামেই পরিচিত। ফোন পেলেই ছুটে যেতেন এই মানুষটি, উদ্ধার করতেন বন্যপ্রাণী। কোথাও আহত বানর, বিদ্যুতের তারে ঝুলে থাকা পাখি, লোকালয়ে ঢুকে পড়া অজগর, এসিডে ঝলসে যাওয়া শকুন কিংবা পাচারকারীর কবল থেকে উদ্ধার বন্যপ্রাণী পরম যত্নে সুস্থ করে বনে অবমুক্ত করতেন তিনি।
সিতেশ রঞ্জন দেবের জীবন যেন একটি অসাধারণ রূপান্তরের গল্প। ছোটবেলায় বাবা শিরীষ রঞ্জন দেবের সঙ্গে শিকারে যেতেন। তখন দেশে বন্যপ্রাণী শিকারে কঠোর বিধিনিষেধও ছিল না। ১৯৮৬ সালে বাবার মৃত্যুর পর তিনিও কিছু দিন শিকার করেন। কিন্তু খুব দ্রুতই তাঁর উপলব্ধি হয়, প্রকৃত বীরত্ব প্রাণ নেওয়ায় নয়, প্রাণ বাঁচানোর মধ্যেই। সেই উপলব্ধিই বদলে দেয় তাঁর জীবন।
মানুষের হাতে নির্যাতিত, বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে আহত, এসিডে ঝলসে যাওয়া, সড়ক দুর্ঘটনায় জখম কিংবা পাচারকারীর কবল থেকে উদ্ধার হওয়া অসংখ্য বন্যপ্রাণীর শেষ ঠিকানা ছিল শ্রীমঙ্গলের বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। নিজ বাড়ির ছোট্ট একটি প্রাণীসেবাকেন্দ্র থেকে শুরু হয়েছিল এই যাত্রা। পরে রূপসপুর বাগানবাড়িতে স্থানান্তরিত হয়ে সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। গত কয়েক দশকে তাঁর হাত ধরে চিকিৎসা ও পরিচর্যা পেয়ে হাজারো বন্যপ্রাণী সুস্থ হয়ে ফিরে গেছে প্রকৃতির কোলে।
১৯৯১ সালের জানুয়ারিতে পাত্রখলা চা বাগানে বন্য শুকর তাড়াতে গিয়ে বিশাল এক ভারতীয় ভাল্লুকের আক্রমণের শিকার হন তিনি। ভাল্লুকের থাবায় একটি চোখ, নাক, গালের বড় অংশ, মুখের একাংশ এবং দাঁত হারান। মৃত্যুর সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই শেষে ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে একাধিক প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে তিনি নতুন জীবন ফিরে পান।
নিজেই বলতেন- ”এটি আমার দ্বিতীয় জীবন।” সেই দ্বিতীয় জীবন তিনি উৎসর্গ করেছিলেন বন্যপ্রাণীর সেবায়।



