লক্ষ্মীপুরের গ্রাম থেকে হার্ভার্ড কেনেডি স্কুল: আফসানা আলম প্রীতির অনুপ্রেরণার যাত্রা

লক্ষ্মীপুরের একটি প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু হওয়া পথচলা। সেই পথ পেরিয়েছে ঢাকার শিক্ষাঙ্গন, গবেষণা ও উন্নয়ন খাত, যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা এবং শেষ পর্যন্ত পৌঁছেছে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি পাবলিক পলিসি ফেলোশিপে। অধ্যবসায়, কৌতূহল এবং নিরন্তর পরিশ্রমের মাধ্যমে এমনই এক অনন্য যাত্রার গল্প গড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের (এমসিজে) সাবেক শিক্ষার্থী আফসানা আলম প্রীতি।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের বোস্টনে বসবাসরত প্রীতি সম্প্রতি হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের অধীনে পাবলিক পলিসি ফেলো হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। এর আগে তিনি ম্যাসাচুসেটস স্টেট হাউসে লেজিসলেটিভ ইন্টার্ন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন, যা তার জননীতি ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে কাজের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
প্রীতির বেড়ে ওঠা লক্ষ্মীপুরের একটি গ্রামে। যেখানে অনেক মেয়ের জন্য উচ্চশিক্ষা এখনও স্বপ্নের মতো, সেখানে তার যাত্রাও ছিল নানা বাধা ও সামাজিক বাস্তবতার বিরুদ্ধে এগিয়ে চলার গল্প। তার অনেক সহপাঠীর বিয়ে হয়ে যায় উচ্চমাধ্যমিক শেষ হওয়ার আগেই। কিন্তু পরিবারের সমর্থন, বিশেষ করে মায়ের উৎসাহ এবং বাবার কঠোর পরিশ্রম তাকে ভিন্ন এক পথ বেছে নেওয়ার সাহস জুগিয়েছে।

উচ্চশিক্ষার জন্য প্রথমে তিনি ভর্তি হন হলিক্রস কলেজে। পরবর্তীতে ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যয়নের সুযোগ পান। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনেই তিনি উপলব্ধি করেন যে শুধু পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দ্বিতীয় সেমিস্টার থেকেই বিভিন্ন ইন্টার্নশিপ, প্রশিক্ষণ, কর্মশালা ও সম্মেলনে অংশ নিতে শুরু করেন। এসব অভিজ্ঞতা তাঁর পেশাগত দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
স্নাতক সম্পন্ন করার পর গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে কাজ শুরু করেন প্রীতি। লিঙ্গসমতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কাজ করতে করতেই তার আগ্রহ তৈরি হয় জননীতি ও শাসনব্যবস্থা বিষয়ে। পরবর্তীতে তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণকালীন চাকরির পাশাপাশি বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি নিতে থাকেন।
তবে বিদেশে পড়াশোনার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ মোটেও সহজ ছিল না। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে পূর্ণ স্কলারশিপ বা ফান্ডিং ছাড়া বিদেশে যাওয়ার সুযোগ ছিল না তার। দীর্ঘ প্রস্তুতি ও আবেদন প্রক্রিয়ার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন (International Development) বিষয়ে স্কলারশিপসহ স্নাতকোত্তর অধ্যয়নের সুযোগ পান।
২০২২ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। নতুন দেশে একজন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসেবে পড়াশোনার পাশাপাশি তাকে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইনিং হলে কাজ করা, কফিশপে চাকরি, টিউটরিং এবং আবাসিক হলের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন—সবকিছু সামলে এগিয়ে নিতে হয়েছে নিজের একাডেমিক জীবন। পরিবার থেকে দূরে থাকা, আর্থিক চাপ এবং নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার সংগ্রামও ছিল প্রতিদিনের বাস্তবতা।
মাস্টার্সে অধ্যয়নকালে তার আগ্রহ আরও গভীর হয় জননীতি, রাজনৈতিক বিজ্ঞান, শাসনব্যবস্থা এবং জেন্ডার বিষয়ে। এই আগ্রহ থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন পাবলিক পলিসিতে পিএইচডি করার। পরে ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস বোস্টনে (UMass Boston) পাবলিক পলিসিতে পিএইচডি প্রোগ্রামে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান।
পিএইচডি গবেষণার পাশাপাশি তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়াকে কাছ থেকে জানার সুযোগ পান ম্যাসাচুসেটস স্টেট হাউসে লেজিসলেটিভ ইন্টার্ন হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে। মাত্র দুটি পদের জন্য অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতামূলক এই ইন্টার্নশিপে নির্বাচিত হওয়াকে তিনি নিজের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখেন।
স্টেট হাউসে কাজ করার সময় তিনি নির্বাচন আইনবিষয়ক কমিশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেখানে নারী, অভিবাসী এবং পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিভিন্ন নীতি ও উদ্যোগ নিয়ে কাজ করার সুযোগ পান। ক্লাসরুমে জননীতি নিয়ে যে আলোচনা করতেন, বাস্তবে সেই নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ার অংশ হওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর জন্য ছিল এক অনন্য অর্জন।
পরবর্তীতে তাঁর এই অভিজ্ঞতা ও গবেষণার ধারাবাহিকতায় হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের পাবলিক পলিসি ফেলোশিপে যুক্ত হওয়ার সুযোগ আসে। বর্তমানে তিনি গবেষণা, নীতি বিশ্লেষণ এবং জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে কাজ করে যাচ্ছেন।
আফসানা আলম প্রীতির গল্প শুধু একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত সাফল্যের ইতিহাস নয়; এটি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা অসংখ্য তরুণ-তরুণীর সম্ভাবনার প্রতিচ্ছবি। তার বিশ্বাস, পথচলার প্রতিটি ধাপে কেউ না কেউ তার জন্য সুযোগ তৈরি করেছেন, সাহস জুগিয়েছেন। ভবিষ্যতে তিনিও এমন কিছু করতে চান, যা অন্য কারও স্বপ্নপূরণের পথে অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়াবে।



