শতবর্ষী মায়ের ঠাঁই হলো না ছেলের নতুন বাড়িতে, কুমিল্লায় হৃদয়বিদারক ঘটনা

একশ বছরের জীবনে মানুষ কত কিছুই না দেখে-যুদ্ধ, পরিবর্তন, সময়ের পালাবদল, আর শেষ বয়সে এসে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত যে আশ্রয়-সন্তানের স্নেহ। কিন্তু কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের আলকরা ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামে ছামেনা খাতুনের গল্প যেন সেই স্বাভাবিক প্রত্যাশাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে দেয়। শতবর্ষী এই বৃদ্ধার জীবনে বার্ধক্য এসেছে শান্তি নয়, বরং অবহেলা আর অনিশ্চয়তার ভার হয়ে।
জীবনের প্রায় এক শতাব্দী পেরিয়ে ছামেনা খাতুন এখন চলতে ফিরতে প্রায় অক্ষম। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তাঁর জন্ম ১৯৩১ সালের ২২ নভেম্বর। স্বামী আবদুল হকের মৃত্যুর পর থেকেই তাঁর জীবনের ছন্দ ভেঙে যায়। এক ছেলে ও তিন মেয়ের জননী হয়েও তিনি শেষ বয়সে এসে হয়ে পড়েন একরকম আশ্রয়হীন।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, তাঁর একমাত্র ছেলে ফয়েজ আহমেদ ২০০৬ সাল থেকে সৌদি আরবে কর্মরত। প্রবাসজীবনের আয়ে তিনি নিজের জন্য নতুন একটি বিল্ডিং নির্মাণ করলেও সেই নতুন ঘরের দরজা খুলে যায়নি মায়ের জন্য। বরং অভিযোগ রয়েছে, বছরের পর বছর মায়ের দায়িত্ব এড়িয়ে তিনি তাঁকে পাশের বাড়িতে থাকা মেয়ের কাছে পাঠিয়ে দেন।
২০১১ সাল থেকে ছামেনা খাতুন বসবাস করছেন তাঁর মেয়ে রোকেয়া বেগমের জরাজীর্ণ ঘরে। ছোট একটি সংসার, সীমিত আয়, আর তার মধ্যেই একজন শতবর্ষী মায়ের যত্ন—এই বাস্তবতা যেন দুই পরিবারের ওপরই চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবুও রোকেয়া বেগম দাবি করেন, সব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তাঁরা মাকে ফেলে রাখেননি।

গল্পের মোড় ঘোরে চলতি বছরের শুরুতে। জানুয়ারিতে দেশে ফেরেন ছেলে ফয়েজ আহমেদ। স্থানীয়দের অনুরোধে এবং গ্রাম্য আলোচনার পর মাকে তিনি নিজের নতুন নির্মিত ভবনে নিয়ে যান। অনেকেই ভেবেছিলেন, অবশেষে হয়তো মায়ের জীবনে কিছুটা শান্তি ফিরবে। কিন্তু সেই আশার আলো খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি।
অভিযোগ অনুযায়ী, ৪ মে ফয়েজ আহমেদ পুনরায় সৌদি আরবে ফিরে যাওয়ার পরের দিন ভোরেই তাঁর স্ত্রী রুমা বেগম বৃদ্ধা ছামেনা খাতুনকে নতুন ঘর থেকে বের করে দেন। সেই ভোরের ঘটনা এখন গ্রামজুড়ে কানাঘুষার বিষয়। একজন শতবর্ষী মায়ের চোখে তখন ছিল আবারও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের অন্ধকার।
রোকেয়া বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তাঁর ভাই বিদেশে থাকলেও মায়ের দায়িত্ব ঠিকভাবে নেয় না। বারবার অপমান, অবহেলা আর ঘরছাড়া হওয়ার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন তাঁর মা। সমাজের অনুরোধে ভাই একবার মাকে নিজের ঘরে নিয়েছিলেন, কিন্তু সেই আশ্রয়ও স্থায়ী হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বিষয়টি শুধু একটি পারিবারিক দ্বন্দ্ব নয়, বরং সামাজিক দায়িত্ববোধের এক গভীর প্রশ্ন। শতবর্ষী একজন মানুষ যখন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়ান, তখন তাঁর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয় নিরাপত্তা ও মর্যাদা। কিন্তু ছামেনা খাতুনের ক্ষেত্রে সেই মৌলিক অধিকারই যেন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
অভিযুক্ত পক্ষে বক্তব্য নিতে যোগাযোগ করা হলেও তা পাওয়া যায়নি। ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
এদিকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। ইউনিয়ন পরিষদের এক প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ঘটনাটি যাচাই করে গ্রামবাসীকে সঙ্গে নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করা হবে। উপজেলা প্রশাসনও জানিয়েছে, বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং আইন অনুযায়ী বৃদ্ধার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে প্রশাসনিক আশ্বাসের বাইরে বাস্তবতা হলো-একজন শতবর্ষী নারী আজও মেয়ের জরাজীর্ণ ঘরে দিন কাটাচ্ছেন, যেখানে বার্ধক্যের ভারের সঙ্গে যোগ হয়েছে অবহেলার ভার। এই গল্প শুধু ছামেনা খাতুনের নয়, বরং সমাজের সেই নীরব প্রশ্নের প্রতিচ্ছবি- আমরা কি সত্যিই আমাদের প্রবীণদের প্রাপ্য সম্মান দিতে পারছি?



