বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনরবিবার, ৭ জুন, ২০২৬
স্পটলাইট

৬ দফার নেপথ্যে সাহসী নারীরা: স্বাধীনতার বীজ বপনের গল্প

images

১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকারের দাবি সুস্পষ্ট রূপ পায়।

ইতিহাসে ছয় দফার কথা উঠলেই সাধারণত পুরুষ নেতাদের নাম বেশি উচ্চারিত হয়, কিন্তু এই আন্দোলনের নেপথ্যে যে অসংখ্য নারী নিরলস শ্রম, সাহস ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়েছিলেন, তাদের অবদান অনেক সময়ই আড়ালে থেকে যায়।
ছয় দফা ছিল কেবল একটি রাজনৈতিক দাবি নয়; এটি ছিল বাঙালির আত্মমর্যাদা ও স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। এই আন্দোলনের বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

তৎকালীন নারী নেত্রী ও কর্মীরা গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত মানুষের মধ্যে ছয় দফার তাৎপর্য তুলে ধরেন। বিশেষ করে বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব আন্দোলনের পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার সহধর্মিণী ছিলেন না, বরং ছিলেন সংগ্রামের এক দৃঢ় প্রেরণার উৎস।
রাজপথের আন্দোলনেও নারীদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন এবং বিভিন্ন প্রগতিশীল সংগঠনের নারী কর্মীরা মিছিল, সভা ও সমাবেশে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন।

পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল কিংবা গ্রেপ্তারের ভয় তাদের দমাতে পারেনি। অনেক নারী আন্দোলনের সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন, অন্যদের সাহস জুগিয়েছেন এবং আন্দোলনের গতিকে আরও বেগবান করেছেন।
আন্দোলনের কঠিন সময়ে যখন অনেক রাজনৈতিক নেতা কারাগারে বন্দি ছিলেন, তখন নারীরাই হয়ে ওঠেন যোগাযোগের নির্ভরযোগ্য সেতুবন্ধন। তারা গোপনে বার্তা আদান-প্রদান করেছেন, আত্মগোপনে থাকা নেতাদের সহায়তা করেছেন এবং আন্দোলনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহের কাজ করেছেন। তাদের বিচক্ষণতা ও সাহস আন্দোলনের সাংগঠনিক শক্তিকে অটুট রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এছাড়া কারাবন্দী নেতাদের পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রেও নারীদের অবদান ছিল অসাধারণ। তারা পরিবারগুলোর খোঁজখবর নিয়েছেন, মানসিক সাহস যুগিয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দিয়েছেন। এই মানবিক সহমর্মিতা আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল এবং দীর্ঘ সংগ্রামে টিকে থাকার শক্তি জুগিয়েছিল।
ছয় দফা আন্দোলনে নারীদের এই সক্রিয় অংশগ্রহণ পরবর্তীকালে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাদের আরও ব্যাপক সম্পৃক্ততার ভিত্তি তৈরি করে।

স্বাধীনতার সংগ্রামে নারী যে কেবল সহযাত্রী নয়, বরং একজন সমান অংশীদার—ছয় দফা আন্দোলন তারই উজ্জ্বল প্রমাণ।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ছয় দফা আন্দোলনের কথা স্মরণ করলে তাই শুধু নেতাদের নয়, সেইসব সাহসী নারীদের কথাও মনে রাখতে হবে, যারা নীরবে সংগ্রামের আগুন জ্বালিয়ে রেখেছিলেন। তাদের আত্মত্যাগ, সাহস ও দেশপ্রেমই স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দেওয়ার পথে এক শক্তিশালী ভিত্তি নির্মাণ করেছিল।

৬ দফাসাহসী নারীস্বাধীনতা