৪০০ বছরের ঐতিহ্য ভেঙে ভ্যাটিকানের ক্ষমতার কেন্দ্রে নারী

ক্যাথলিক চার্চের ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক যুক্ত হলো। বিশ্বের ক্ষুদ্রতম স্বাধীন রাষ্ট্র হলেও ধর্মীয় প্রভাবের দিক থেকে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি ভ্যাটিকান এবার তাদের যোগাযোগ বিভাগের নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো একজন সাধারণ নারীকে নিয়োগ দিয়েছে।
পোপ চতুর্দশ লিও ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী ১ নভেম্বর থেকে ভ্যাটিকানের ‘ডিকাস্ট্রি ফর কমিউনিকেশন’-এর নতুন প্রিফেক্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন মারিয়া মন্তসেরাত আলভারাদো। তিনি বিদায়ী প্রধান পাওলো রুফিনির স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন।
এই নিয়োগকে শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন বললে ভুল হবে। কারণ ভ্যাটিকানের দীর্ঘ ইতিহাসে কোনো বিভাগের সর্বোচ্চ দায়িত্বে এই প্রথম একজন সাধারণ নারী (Laywoman) দায়িত্ব পাচ্ছেন। তিনি সন্ন্যাসিনী নন, বরং একজন পেশাদার যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে এমন দায়িত্ব পাওয়ায় তিনি রোমান কুরিয়ার অন্যতম কনিষ্ঠ প্রধানও হতে যাচ্ছেন।
যে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিচ্ছেন তিনি
বর্তমানের ডিকাস্ট্রি ফর কমিউনিকেশন আসলে শতাব্দীজুড়ে গড়ে ওঠা ভ্যাটিকানের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও তথ্যপ্রচার সংস্থার সমন্বিত রূপ। ১৫৮৭ সালে পোপ পঞ্চম সিক্সটাসের প্রতিষ্ঠিত ছাপাখানা থেকে শুরু হয়েছিল এই যাত্রা। পরে ধাপে ধাপে যুক্ত হয় সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন, প্রকাশনা সংস্থা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম।
ভ্যাটিকানের বিখ্যাত সংবাদপত্র ‘ল’অসজারভেতোরে রোমানো’ প্রকাশ শুরু হয় ১৮৬১ সালে। এরপর ১৯৩১ সালে চালু হয় ‘ভ্যাটিকান রেডিও’, যার প্রযুক্তিগত নকশায় ভূমিকা রেখেছিলেন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী গুগলিয়েলমো মার্কোনি। ১৯৯৫ সালে ‘vatican.va’ ওয়েবসাইট চালুর মাধ্যমে ইন্টারনেট যুগে প্রবেশ করে ভ্যাটিকান। অবশেষে ২০১৫ সালে সাবেক পোপ ফ্রান্সিস বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমকে একীভূত করে গঠন করেন বর্তমান ডিকাস্ট্রি ফর কমিউনিকেশন।

কে এই মারিয়া আলভারাদো?
মেক্সিকো সিটিতে জন্ম নেওয়া মারিয়া মন্তসেরাত আলভারাদো যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামিতে বেড়ে ওঠেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর তিনি যোগাযোগ ও জনসম্পর্ক খাতে কর্মজীবন শুরু করেন।
প্রথমে ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান বেকেট ফান্ডে কাজ করে ধীরে ধীরে নেতৃত্বের পর্যায়ে পৌঁছান। পরে ক্যাথলিক গণমাধ্যমে যোগ দিয়ে সাংবাদিকতা ও মিডিয়া ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
ভ্যাটিকানে যোগদানের আগে তিনি বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ক্যাথলিক সম্প্রচারমাধ্যম ইটারনাল ওয়ার্ড টেলিভিশন নেটওয়ার্ক (EWTN)-এর প্রেসিডেন্ট ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই নিয়োগ?
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত ভ্যাটিকানের চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ারই অংশ। সাবেক পোপ ফ্রান্সিস দীর্ঘদিন ধরে চার্চ প্রশাসনে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পক্ষে ছিলেন। তার সময়েই বেশ কয়েকজন নারীকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে আনা হয়।
বর্তমান পোপ লিওও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নেতৃত্ব নির্বাচনে লিঙ্গের চেয়ে দক্ষতা ও পেশাদার অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
কী হবে তার মূল দায়িত্ব?
ডিকাস্ট্রি ফর কমিউনিকেশন মূলত ভ্যাটিকানের সব ধরনের গণমাধ্যম, তথ্যপ্রচার এবং জনসংযোগ কার্যক্রম পরিচালনা করে।
এর আওতায় রয়েছে ভ্যাটিকান রেডিও, ভ্যাটিকান নিউজ, ল’অসজারভেতোরে রোমানো, হোলি সি প্রেস অফিস, ভ্যাটিকান মিডিয়া এবং প্রকাশনা সংস্থাগুলো।
মারিয়া আলভারাদোর প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে দ্রুত পরিবর্তনশীল ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে চার্চের বার্তা আরও কার্যকরভাবে বিশ্বব্যাপী পৌঁছে দেওয়া, তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানো এবং ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা।
একসময় পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত হিসেবে পরিচিত ভ্যাটিকানের প্রশাসনে এই নিয়োগ শুধু একটি পদোন্নতি নয়; বরং এটি চার্চের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কাঠামো ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।



