বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
নারী

সাগরজুড়ে র’ক্তের ছাপ, এক দিনে ৭০০ তিমি হ’ত্যা

WhatsApp Image 2026-06-04 at 8.21.02 PM

উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের প্রত্যন্ত ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জে আবারও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন তিমি শিকারের উৎসব ‘গ্রিন্ডাড্রাপ’ (Grindadráp)। চলতি বছরের শিকার অভিযানে মাত্র একদিনেই ৭ শতাধিক তিমি ও ডলফিন হত্যা করা হয়েছে, যার ফলে উপকূলীয় সাগরের পানি রক্তে লাল হয়ে ওঠে। ঘটনার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্বজুড়ে পরিবেশবাদী ও প্রাণী অধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

সামুদ্রিক সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন সি শেফার্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ মে ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জের তিনটি পৃথক এলাকায় পরিচালিত শিকারে মোট ৭০৬টি সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী নিহত হয়। এর মধ্যে রাজধানী তোর্শাভনের কাছে ৪০২টি লং-ফিনড পাইলট তিমি এবং ৪টি বটলনোজ ডলফিন, স্কালাবোটনুর এলাকায় ১৬৮টি এবং ভালভিক এলাকায় ১৩২টি আটলান্টিক হোয়াইট-সাইডেড ডলফিন হত্যা করা হয়।

প্রথা অনুযায়ী স্থানীয় জেলেরা সমুদ্রে থাকা তিমি ও ডলফিনের ঝাঁককে নৌকা দিয়ে তাড়িয়ে অগভীর উপসাগরে নিয়ে আসে। পরে সেগুলোকে তীরে আটকে ফেলে বিশেষ হুক, দড়ি ও ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে হত্যা করা হয়। সমালোচকদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় প্রাণীগুলো দীর্ঘ সময় ধরে চরম যন্ত্রণা ভোগ করে।

সি শেফার্ডের দাবি, এবারের শিকারে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে, কারণ ডলফিন হত্যা করতে ব্যবহৃত বাধ্যতামূলক ‘স্পাইনাল ল্যান্স’-এর ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে অনেক প্রাণীকে কেবল ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয় এবং মৃত্যুর আগে তাদের দীর্ঘ সময় কষ্ট সহ্য করতে হয়।

সংস্থাটির ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জভিত্তিক প্রচারণা পরিচালক ভ্যালেন্টিনা ক্রাস্ট বলেন, “এই প্রাণীগুলোর ওপর যে মাত্রার যন্ত্রণা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা কোনোভাবেই ন্যায়সঙ্গত বা গ্রহণযোগ্য নয়। আধুনিক যুগে এমন নিষ্ঠুর প্রথার কোনো স্থান থাকতে পারে না।”

হাজার বছরের ঐতিহ্য নাকি অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুরতা?

‘গ্রিন্ডাড্রাপ’ ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জের ইতিহাসে প্রায় এক হাজার বছরের পুরোনো একটি প্রথা। ভাইকিং যুগ থেকে চলে আসা এই শিকারকে স্থানীয়রা তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। দ্বীপপুঞ্জটির প্রশাসনের ভাষ্য, সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদের অঞ্চলে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর জন্য এই শিকার একসময় গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য উৎস ছিল এবং এখনও স্থানীয় সম্প্রদায়ের খাদ্য সরবরাহে ভূমিকা রাখে।

তবে সমালোচকদের মতে, আধুনিক যুগে উন্নত খাদ্যব্যবস্থা ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের কারণে এমন শিকারের আর কোনো প্রয়োজন নেই। তাদের দাবি, এটি এখন কেবল একটি ঐতিহ্যের নামে পরিচালিত গণহত্যা।

আন্তর্জাতিক উদ্বেগ

বিশ্বজুড়ে প্রাণী অধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই প্রথা বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাইলট তিমি ও ডলফিন অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং সামাজিক প্রাণী। তারা পরিবারভিত্তিক দলে বাস করে এবং পরস্পরের সঙ্গে জটিল যোগাযোগ ব্যবস্থা বজায় রাখে। তাই একটি দলের সদস্যদের একসঙ্গে হত্যা করা পুরো সামাজিক কাঠামো ধ্বংস করে দেয়।

পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, বারবার এ ধরনের বৃহৎ শিকার উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জের প্রশাসন দাবি করে, শিকার হওয়া প্রাণীগুলোর সংখ্যা এখনও টেকসই সীমার মধ্যে রয়েছে এবং বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতেই শিকারের অনুমতি দেওয়া হয়।

তবু প্রতি বছর রক্তে লাল হয়ে যাওয়া ফ্যারোর উপকূল নতুন করে সেই প্রশ্নই সামনে আনে- সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার নামে প্রাণীদের এমন নির্মম মৃত্যুকে কি এখনও গ্রহণযোগ্য বলা যায়?

উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরউৎসবগ্রিন্ডাড্রাপতিমি