‘লেডি মোবাইল ডাক্তার’ মহিমা: নারীদের অনুপ্রেরণার প্রতীক

উপকূলীয় জেলা ভোলা-যেখানে জীবন মানেই প্রতিদিনের সংগ্রাম, সীমাবদ্ধতা আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই। সেই জনপদেই দারিদ্র্য, কুসংস্কার ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে এক তরুণী হয়ে উঠেছেন নারীদের আস্থার প্রতীক। তার নাম মহিমা বেগম। স্থানীয়ভাবে তিনি এখন পরিচিত ‘লেডি মোবাইল ডাক্তার’ নামে।
ভোলার সদর উপজেলার ধনিয়া ইউনিয়নের তালুকদার বাড়ির যৌথ পরিবারে জন্ম ও বেড়ে ওঠা মহিমার। কৃষিশ্রমিক বাবার সীমিত আয়ে ১০ সদস্যের সংসার চালানো ছিল কঠিন। অভাব-অনটনের মধ্যেই কাটে তার শৈশব। এসএসসি পাসের পর অর্থসংকটের কারণে থেমে যায় পড়াশোনা। কিন্তু থেমে যায়নি স্বপ্ন।
২১ বছরের সংগ্রামী এই তরুণীর জীবনে একসময় নেমে আসে পারিবারিক সংকটও। চারপাশের কটূক্তি, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ও সামাজিক বাধা তাঁর পথ আটকে দিতে চাইলেও আত্মবিশ্বাস হারাননি তিনি। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর দৃঢ় ইচ্ছাই তাঁকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে।
প্রচলিত সামাজিক ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেই প্রযুক্তিনির্ভর পেশায় যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মহিমা। শুরুতে ভোলার পরিচিত মোবাইল সার্ভিসিং প্রতিষ্ঠান ‘আকতার মোবাইল টেলিকম’-এ প্রশিক্ষণ নেন তিনি। সেখানে মোবাইলের হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার সংক্রান্ত নানা কারিগরি দক্ষতা অর্জন করেন। বর্তমানে যে প্রতিষ্ঠানে কাজ শিখেছিলেন, সেখানেই চাকরি করছেন মহিমা। মাসে প্রায় ১৭ হাজার টাকা আয় করে পরিবারের আর্থিক উন্নয়নে অবদান রাখছেন। একসময় যে মেয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটাতেন, আজ তিনিই পরিবারের অন্যতম ভরসা।

মহিমা জানান, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থা (জিজেইউএস) বাস্তবায়িত ‘রেইজ প্রকল্প’- এর আওতায় তিনি ছয় মাসের কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ পান। পাশের বাড়ির একটি উঠান বৈঠকের মাধ্যমে এই প্রশিক্ষণের খবর জানতে পারেন তিনি। প্রশিক্ষণের শুরুতে পাঁচ দিনের জীবন দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ক প্রশিক্ষণ। এ অংশ নিয়ে উদ্যোক্তার গুণাবলি, যোগাযোগ দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি, কুসংস্কার মোকাবিলা ও সামাজিক যোগাযোগ তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ধারণা লাভ করেন। এই প্রশিক্ষণই তার আত্মবিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে তোলে।
মহিমা বলেন, শুরুতে অনেকেই মেয়েদের এই পেশায় কাজ করাকে ভালোভাবে নেয়নি। নানা ধরনের কথা শুনতে হয়েছে। কিন্তু পরিবারের সহযোগিতা আর নিজের আত্মবিশ্বাস আমাকে এগিয়ে যেতে সাহস দিয়েছে। এখন কাজ শিখে চাকরি করছি এটাই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন। অনেক নারী গ্রাহক স্বস্তি নিয়ে আমার কাছে আসেন। তারা মনে করেন, একজন নারী হিসেবে আমি তাদের ব্যক্তিগত বিষয়গুলো বুঝতে পারি। এখন অনেক নারী নিয়মিত আমার কাছে মোবাইল ঠিক করাতে আসেন। তারাই আবার অন্যদেরও পাঠান।
তিনি আরও বলেন, নারীরা যখন আমার ওপর আস্থা রাখেন, তখন সেই বিশ্বাস রক্ষা করতে পারাটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। স্থানীয় মেয়েদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তায় পাশে থাকতে পারছি এটাই গর্বের।
মোবাইল সার্ভিসিং খাতে নারী হিসেবে মহিমার উপস্থিতি তৈরি করেছে আলাদা এক আস্থা। বিশেষ করে নারী গ্রাহকদের একটি বড় অংশ এখন তার কাছেই মোবাইল সার্ভিস করাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার এবং সাইবার বুলিং, ব্যক্তিগত ছবি ফাঁস, ফেক আইডি কিংবা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মতো ঘটনার আশঙ্কা বাড়ায় নারীদের মধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বেড়েছে। অনেক নারী মোবাইল সার্ভিসিং সেন্টারে গিয়ে ফোনের লক, ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য শেয়ার করতে অস্বস্তি অনুভব করেন। সেই জায়গাতেই মহিমা হয়ে উঠেছেন নির্ভরতার প্রতীক। মহিমার স্বপ্ন, একদিন নিজের এলাকায় আধুনিক মোবাইল সার্ভিসিং সেন্টার গড়ে তোলা। শুধু নিজের কর্মসংস্থান নয়, সেখানে অন্য নারীদেরও প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী করতে চান তিনি। পাশাপাশি এনএসডিওর লেভেল-ওয়ান সম্পন্ন করে ট্রেইনার বা সহকারী ট্রেইনার হিসেবেও কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে তার।

তিনি বলেন, আমি চাই, আমার মতো পিছিয়ে পড়া নারীরাও প্রযুক্তিনির্ভর কাজ শিখে উদ্যোক্তা হয়ে উঠুক। ভবিষ্যতে বড় সার্ভিসিং সেন্টার করতে চাই, যেখানে নারীরা নিরাপদ পরিবেশে কাজ শিখতে পারবে।
মহিমার প্রশিক্ষক সাত্তার হোসেন বলেন, মহিমা অত্যন্ত মনোযোগী শিক্ষার্থী ছিল। শেখার আগ্রহ ও নিয়মিত চর্চা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। সে এখন নিজের দক্ষতা দিয়ে মানুষের আস্থা অর্জন করেছে। ভবিষ্যতে সে আরও সফল হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
এদিকে সদর উপজেলার সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, নারীদের প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানো গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে নারীর আর্থিক স্বাধীনতা ও সামাজিক ক্ষমতায়ন আরও শক্তিশালী হবে।
জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. ইকবাল হোসেন বলেন, প্রযুক্তি খাতে যত বেশি নারী এগিয়ে আসবেন, ততই তারা স্বাবলম্বী হবেন। এতে রাষ্ট্র, সমাজ ও দেশের অর্থনীতি উপকৃত হবে।
আর গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থা (জিজেইউএস)-এর নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন মহিন বলেন, শুধু আইন করলেই ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। প্রযুক্তিনির্ভর পেশায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে পারলে নারীদের জন্য আরও নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি হবে। মহিমার মতো নারী প্রযুক্তিকর্মীরা একদিকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন, অন্যদিকে নারীদের ডিজিটাল নিরাপত্তা ও আস্থার জায়গাও শক্তিশালী করছেন।
তিনি আরও বলেন, দারিদ্র্য, কুসংস্কার ও সামাজিক বাধা পেরিয়ে মহিমা বেগমের এই এগিয়ে চলা এখন ভোলার অনেক তরুণীর কাছে অনুপ্রেরণার নাম। তার গল্প যেন নতুন করে মনে করিয়ে দেয় সুযোগ, প্রশিক্ষণ ও দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি থাকলে বদলে যেতে পারে একজন মানুষের জীবন, বদলে যেতে পারে পুরো সমাজও।



