বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ১০ জুন, ২০২৬
নারী

পরিবারের দায় তো পুরুষের একার নয়—তবু কেন উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত নারী?

lgsp

নারীর উত্তরাধিকার ও সম্পত্তির অধিকার নিয়ে বিতর্ক বাংলাদেশে নতুন নয়। জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১ ঘোষণার সময় যেমন প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল, ঠিক তেমনই চিত্র আবারও দেখা গেছে সম্প্রতি নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর।
দুই ক্ষেত্রেই কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে প্রতিবাদ এসেছে। তাদের দাবি, নারী-পুরুষের সমান উত্তরাধিকার নিশ্চিত করার যেকোনো প্রস্তাব ইসলামি শিক্ষা ও রীতিনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এই প্রতিবাদের ভাষা অনেক ক্ষেত্রেই ছিল কটূ ও অবমাননাকর। নারীদের উদ্দেশে ব্যবহৃত কিছু শব্দ উল্লেখ করাও অস্বস্তিকর। তবে এটাও মনে রাখা জরুরি—সমাজের সম্মানিত নারীদের ‘বেশ্যা’ বলে গালি দেওয়া ইসলাম ধর্মের শিক্ষা ও নৈতিকতার সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

অনলাইনে বিভিন্ন ধর্মীয় বক্তৃতা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, অধিকাংশ বক্তাই নারীদের কম উত্তরাধিকার পাওয়াকে বৈধতা দিতে একটি যুক্তি সামনে আনেন। যুক্তিটি হলো—পুরুষই পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব বহন করে। বিয়ের আগে নারীর দায়িত্ব বাবা ও ভাইদের, বিয়ের পরে স্বামী ও সন্তানদের। ফলে নারীর কম সম্পত্তি পাওয়াই যৌক্তিক।

কিন্তু বাস্তবতার পরিসংখ্যান বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা।
২০১৩ সালে নারী অধিকার নিয়ে আলোচনার সময় সরকারি তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ১১ শতাংশ পরিবার পরিচালিত হতো নারীদের দ্বারা। অর্থাৎ প্রতি ১০টি পরিবারের মধ্যে ১টিরও বেশি পরিবারে নারীই ছিলেন পরিবারের প্রধান এবং মূল উপার্জনকারী। বর্তমানে সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রায় ১৮ শতাংশ পরিবার নারীপ্রধান।

অর্থাৎ, শুধুমাত্র পুরুষই পরিবারের অর্থনৈতিক দায়িত্ব বহন করেন—এই বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

যখন নারীরা পরিবার ও সমাজে সমানভাবে দায়িত্ব পালন করছেন, তখন ধর্মগ্রন্থের অপব্যাখার মাধ্যমে তাদের সম্পদের মালিকানা ও সমৃদ্ধির সুযোগ কেড়ে নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

ইসলামের ইতিহাসেও নারীর অর্থনৈতিক সক্ষমতার উজ্জ্বল উদাহরণ রয়েছে। ইসলামের শুরুর দিককার অন্যতম বিশ্বাসী খাদিজা (রা.) ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী।

গবেষকরা বলেন, তিনি দরিদ্রদের খাদ্য ও পোশাক দিতেন, আত্মীয়দের আর্থিক সহায়তা করতেন, এমনকি স্বজনদের বিয়েতেও সহযোগিতা করতেন।

আধুনিক বাংলাদেশেও বিপুল সংখ্যক নারী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত। প্রতিদিন লাখ লাখ নারী জাতীয় কর্মশক্তিতে অবদান রাখছেন। তারা শুধু গৃহস্থালি কাজেই সীমাবদ্ধ নন—পরিবারের আয় বৃদ্ধি ও সম্পদ গঠনে প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রাখছেন।

এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে—যদি নারীদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়, তাহলে তারা কেন সেই সম্পদ গঠনের জন্য কঠোর পরিশ্রম করবেন?

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮৬ শতাংশেরও বেশি আসে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে, যেখানে নারী শ্রমিকদের ভূমিকা অপরিসীম। কৃষি উৎপাদন থেকে শুরু করে বিদেশে শ্রম দিয়ে রেমিট্যান্স আনা, এমনকি কর্পোরেট নেতৃত্ব—সব ক্ষেত্রেই নারীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।

তবে উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আইনগুলো এখনও বহু পুরোনো ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ফলে নারীদের অধিকার প্রশ্নে বারবার প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়। অথচ বর্তমান সময়ের বাস্তবতায় নারী-পুরুষ উভয়েই যখন পরিবার ও সমাজে সমান দায়িত্ব পালন করছেন, তখন ধর্মের নামে নারীদের সম্পদের সুযোগ সংকুচিত করা অগ্রহণযোগ্য।

এখানে আরও একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য—অনেক ধর্মেই উত্তরাধিকার সম্পত্তির অসম বণ্টনের বিধান রয়েছে, কিন্তু কোনো ধর্মই সমানভাবে সম্পদ বণ্টন করতে নিষেধ করেনি।

তাহলে কীভাবে বলা যায়, নারী-পুরুষের মধ্যে সমান উত্তরাধিকার নিশ্চিত করার সুযোগ রাখাই ধর্মীয় মূল্যবোধের বিরুদ্ধে?

বাস্তবতা হলো—যেসব নারীর নিজস্ব সম্পত্তি নেই, তাদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা প্রায়ই খাটো করে দেখা হয়। তারা নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন, যা অস্বীকার করার উপায় নেই।
অসম বণ্টন কিংবা বঞ্চনার ফলে নারীরা সম্পদের চূড়ান্ত নিরাপত্তায় পৌঁছাতে পারেন না। বাধাগ্রস্ত হয় তাদের নতুন সম্পদ গড়ার প্রক্রিয়াও। ফলে অনেক নারী আটকে পড়েন দারিদ্র্যের এক দুষ্টচক্রে।

এটি শুধু নারীদের জন্য ক্ষতিকর নয়, বরং এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্যও বড় ধরনের ক্ষতি। কারণ নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বাধাগ্রস্ত হলে সামগ্রিক উন্নয়নও থমকে যায়।

নারীরা যখন বাস্তবে পুরুষের পাশাপাশি অর্থনীতি ও পরিবারকে এগিয়ে নিচ্ছেন, তখন তাদের অধিকার সংকুচিত রাখা কোনো যুক্তিতেই টেকসই হতে পারে না। উত্তরাধিকার নিয়ে সমাজকে বাস্তবতার ভিত্তিতে নতুন করে ভাবতেই হবে।

উত্তরাধিকারনারীপরিবারপুরুষবঞ্চিত