বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনরবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬
নারী

জলবায়ু, অর্থনীতি ও নারীবাদী ভাবনায় সমাজ বদলের পাঠ

sangat-bangladesh-gender-workshop-1777183212

পরিবর্তন কোনো জাদুকরি প্রপঞ্চ নয়; যা রাতারাতি ঘটে যায়। একটি বৈষম্যহীন, টেকসই ও সমতাভিত্তিক সমাজ গড়তে প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন, সঠিক জ্ঞান এবং সম্মিলিত উদ্যোগ। সমাজের প্রতিটি স্তরে শিকড় গেড়ে থাকা জেন্ডার বৈষম্য দূর করতে হলে শুধু স্লোগান নয়, প্রয়োজন কাঠামোগত বিশ্লেষণ। সেই বোধোদয়ের লেন্সটি তৈরি করে দেওয়ার লক্ষ্যেই রাজধানী ঢাকায় সফলভাবে সম্পন্ন হলো সাউথ এশিয়ান ফেমিনিস্ট নেটওয়ার্ক ‘সাংগাত’-এর বাংলাদেশ চ্যাপ্টার আয়োজিত এক বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মশালা। গত ১৭ থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকার লালমাটিয়ায় অবস্থিত এএলআরডি মিলনায়তনে চার দিনব্যাপী এই কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।

এবারের আয়োজনের মূল বিষয়বস্তু ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী ও বহুমাত্রিক– ‘জেন্ডার, উন্নয়ন নীতি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং জেন্ডার-সংবেদনশীল বাজেট’। সমাজ বিশ্লেষণের গভীরে এরা এক সুতায় গাঁথা।

১৯৯৮ সাল থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় নারী অধিকার, মানবাধিকার, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং একটি শক্তিশালী নারীবাদী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কাজ করছে সাংগাত। সংস্থাটির মূল দর্শন হলো–পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর দেয়াল না ভেঙে কোনো প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। সমাজকর্মী, সাংবাদিক, শিক্ষক বা শিক্ষার্থীদের সেই কাঠামোর বাইরে গিয়ে ভাবতে শেখানোই এই আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।

তাত্ত্বিক জ্ঞানের সঙ্গে বাস্তবতার এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছিল এই চার দিনের সেশনে। আলোচনাগুলো প্রাণবন্ত ও অন্তর্দৃষ্টিমূলক করে তুলেছিলেন দেশের দুজন বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও বিশ্লেষক–ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. ফওজিয়া মান্নান এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শরমিন্দ নীলোর্মি।

Advertisements

কর্মশালার আলোচনা কেবল নারী-পুরুষের প্রথাগত অধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং শুরু হয়েছিল পুরুষতন্ত্রের শিকড় সন্ধানের মধ্য দিয়ে। ফেমিনিস্ট ডিসকোর্স বা নারীবাদী দর্শনের আলোকে অংশগ্রহণকারীরা সমাজকে নতুনভাবে পাঠ করার সুযোগ পান। রাষ্ট্রের বড় উন্নয়ন নীতিগুলো কাগজে-কলমে যতটা সমতার কথা বলে, বাস্তবে নারীর অবস্থান সেখানে কোথায়–সেই ব্যবধানটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো হয়।

বিশ্লেষণে উঠে আসে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংকট ‘জলবায়ু পরিবর্তন’-এর প্রসঙ্গ। বৈশ্বিক এই সংকট কোনোভাবেই জেন্ডার-নিরপেক্ষ নয়। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী বহুমাত্রিক ঝুঁকি ও বঞ্চনার শিকার হন বেশি। সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোর কারণে নারীর ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইটা হয় আরও কঠিন।

তাই যে কোনো জলবায়ু মোকাবিলা নীতিতে নারীর অংশগ্রহণ ও সহনশীলতা বাড়ানোর কৌশল কীভাবে যুক্ত করতে হয়। এর পাশাপাশি অত্যন্ত আকর্ষণীয় পর্ব ছিল ‘জেন্ডার-সংবেদনশীল বাজেট’। বলা হয়ে থাকে, একটি রাষ্ট্রের বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, এটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সদিচ্ছার আয়না। বাজেট প্রণয়নে জেন্ডার লেন্স যুক্ত না করলে, অর্থের সঠিক বণ্টন নিশ্চিত হয় না এবং বৈষম্য কমবেশি থেকেই যায়। কীভাবে একটি বাজেট নারী ও প্রান্তিক মানুষের প্রতি আরও সংবেদনশীল হতে পারে, তা অংশগ্রহণকারীদের হাতে-কলমে শেখানো হয় এই সেশনে।

সাংবাদিক, উন্নয়নকর্মী, মানবাধিকার কর্মী, শিক্ষক এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ ৩০ জনেরও বেশি পেশাজীবী এতে অংশ নেন। চার দিনের এই নিবিড় বোঝাপড়া যেন তাদের চিন্তার জগতে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ধুলো ঝেড়ে নতুন এক জানালা খুলে দিয়েছে–তেমনটাই জানান অংশইগ্রহণকারী কেউ কেউ।

কর্মশালার সঙ্গে যুক্তদের আশা, এখান থেকে পাওয়া জ্ঞান কেবল তাত্ত্বিক নোটবুকেই বন্দি থাকবে না; বরং তাদের পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনে এর বাস্তব প্রয়োগ ঘটবে। একজন সাংবাদিক এখন থেকে তাঁর প্রতিবেদনে খুঁজবেন জেন্ডার সংবেদনশীলতার মাত্রা, একজন উন্নয়নকর্মী তাঁর জলবায়ু প্রকল্পে নারীর সুরক্ষাকে দেবেন অগ্রাধিকার।

সাংগাত বাংলাদেশের সমন্বয়ক সোহানা আহমেদের সার্বিক তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এই কর্মশালাটি নিছক কোনো প্রশিক্ষণ ছিল না; এটি ছিল লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা রোধে এবং সমতা প্রতিষ্ঠায় সমমনা মানুষদের নিয়ে একটি শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সফল প্রয়াস।

চার দিন পর অংশগ্রহণকারীরা যখন নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যাচ্ছিলেন, তাদের চোখেমুখে ছিল একটি নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন। এমন এক পৃথিবী, যেখানে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে নারীর কণ্ঠস্বর হবে আরও জোরালো, জাতীয় বাজেট হবে অন্তর্ভুক্তি এবং জলবায়ুর তীব্র সংকটেও নারীরা নিজেদের সুরক্ষিত রাখার সক্ষমতা অর্জন করবেন।

Advertisements
অর্থনীতিজলবায়ুনারীবাদীসমাজ