আমি কখনো বিচারের আশা ছাড়ি নাই: তনুর মা

কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় মামলা দায়েরের ১০ বছর পর এক আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তার নাম হাফিজুর রহমান। তিনি সেনাবাহিনীর সাবেক ওয়ারেন্ট অফিসার।
হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তারের পর বুধবার (২২ এপ্রিল) বিকেলে কুমিল্লা আদালতে হাজির করা হয়। এরপর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আসামির তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন কুমিল্লা সদর আদালত-১ এর সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মমিনুল হক। রিমান্ড শুনানি শেষে সেনাবাহিনীর সাবেক সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে ঢাকায় নিয়ে যায় পিবিআই। এর আগে মঙ্গলবার ঢাকার কেরানীগঞ্জের নিজ বাসা থেকে হাফিজুরকে আটক করেন পিবিআইয়ের সদস্যরা। এরপর তাকে তনু হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে বুধবার বিকেলে কুমিল্লার আদালতে হাজির করা হয়। গ্রেপ্তার বর্তমানে ৫২ বছর বয়সী হাফিজুর রহমান ২০২৩ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসরে গেছেন। তনু হত্যার সময় কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন তিনি।
তনুর মা আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আমি কখনো বিচারের আশা ছাড়ি নাই। আশায় ছিলাম একদিন না একদিন খুনিরার বিচার হইব। যাক অবশেষে একটা খুনি ধরা পড়ল। আমার মেয়েরে অনেক কষ্ট দিয়ে হত্যা করছে তারা। আমি তারার ফাঁসি চাই। দেশবাসী যেন কইতে পারে তনু হত্যার ফাঁসি হইছে।’ আনোয়ারা বেগম আরও বলেন, ‘দীর্ঘ এই সময়ে সাংবাদিকেরা আমরার লগে আছিলো। নাইলে কবেই আমরারে তুলার মতো তুলাধুনা কইরালাইতো। মৃত্যুর আগে আমার একডাই ইচ্ছা, খুনিডির ফাঁসি দেখতাম চাই। বাকি খুনিডির দ্রুত গ্রেপ্তার চাই।’ তনুর বাবা ইয়ার হোসেন বলেন, ‘অনেক অপেক্ষার পর আজকে চোখের শান্তি পাইছি। দেখলাম খুনি হাফিজুর আদালতের কাঠগড়ায়। গত ১০টি বছর ধরে যেখানেই গিয়েছি, মানুষ শুধু বলত তনু হত্যার বিচার কি হবে না? যাক, অবশেষে বিচার পাব বলে কিছুটা হলেও আশা জেগেছে। এখন মানুষকে বলতে পারব, একটা খুনি ধরা পড়ছে। আমি কোর্টকে মান্য করি, শ্রদ্ধা করি। আশা করি দীর্ঘদিন পরে হলেও তনু ন্যায়বিচার পাবে।’
এর আগে ৬ এপ্রিল ১ নম্বর আমলি আদালতের বিচারক মুমিনুল হকের আদালতে হাজির হন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। আদালতের তলবের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি কুমিল্লায় আসেন। এ সময় তিনি মামলার অগ্রগতি জানানোর পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে তিনজনের ডিএনএ নমুনা মেলানোর আবেদন করেন। আদালত তার আবেদনে সম্মতি দেন। ২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করতে গিয়ে আর বাসায় ফেরেননি তনু। পরে খোঁজাখুঁজি করে সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের অদূরে ঝোপের মধ্যে তনুর লাশ পাওয়া যায়। তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়।
পরদিন তার বাবা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অফিস সহায়ক (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) ইয়ার হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। ২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল ও ১২ জুন দুই দফা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তনুর মৃত্যুর কারণ খুঁজে না পাওয়ার তথ্য জানায় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ। এই হত্যাকাণ্ডের শেষ ভরসা ছিল ডিএনএ রিপোর্ট। ২০১৭ সালের মে মাসে সিআইডি তনুর পোশাক থেকে নেওয়া নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করে তিনজন পুরুষের শুক্রাণু পাওয়ার কথা গণমাধ্যমকে জানিয়েছিল। এ ছাড়া তনুর মায়ের সন্দেহ করা তিনজনকে ২০১৭ সালের ২৫ থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত সিআইডির একটি দল ঢাকা সেনানিবাসে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। তবে ওই সময়ে তাদের নাম গণমাধ্যমকে জানায়নি সিআইডি। কুমিল্লায় সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডটি দেশের অন্যতম আলোচিত মামলাগুলোর একটি, যার বিচার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই জনমনে প্রশ্ন ছিল।



