বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ১০ জুন, ২০২৬
নারী

সংরক্ষিত নারী আসনে প্রতিনিধিত্ব বাড়ছে কিন্তু ক্ষমতায়ন কি নিশ্চিত হচ্ছে?

female-mp-1750855101

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর লক্ষ্যে সংরক্ষিত নারী আসন ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত। সংসদে নারীর উপস্থিতি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি ভূমিকা রাখলেও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এই ব্যবস্থা কি সত্যিই নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে পারছে, নাকি এটি কেবল সংখ্যাগত প্রতিনিধিত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ?

গত সোমবার (২০ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে ৩৬ জন প্রার্থীর তালিকা প্রকাশ করেছে বিএনপি। একইসঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ১৩ জনের নাম ঘোষণা করেছে। ফলে একসঙ্গে মোট ৪৯ জন নারী সংসদে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, যা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক বার্তা।

তবে মনোনয়ন তালিকার দিকে নজর দিলে দেখা যায়, অধিকাংশ প্রার্থীই রাজনৈতিক পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী বিএনপির মনোনীত ৩৬ জনের মধ্যে ১০ জন সাবেক সংসদ সদস্য। পাশাপাশি দলীয় নেতাদের স্ত্রী ও কন্যা রয়েছেন সাতজন। এছাড়া ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের চারজন এবং ছাত্রদল থেকে উঠে আসা ছয় নেত্রী মনোনয়ন পেয়েছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে পরাজিত তিনজন প্রার্থীও এই তালিকায় রয়েছেন।

এছাড়াও বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের আরও সাত নেত্রী মনোনীত হয়েছেন।
অন্যদিকে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থীদের মধ্যে জামায়াতের হয়ে সংসদে যাচ্ছেন আটজন নারী। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে যাচ্ছেন দুজন। এছাড়া জাগপা, খেলাফত মজলিস এবং জুলাই শহীদ পরিবারের একজন করে প্রতিনিধি মনোনীত হয়েছেন।

মনোনয়ন বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—সংরক্ষিত নারী আসনের বড় অংশই দলীয় আনুগত্য এবং রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই এটি নারীদের স্বাধীন নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ না দিয়ে দলীয় পরিচিত মুখ কিংবা প্রভাবশালী নেতাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য একটি ‘নিরাপদ আসন’ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

তবে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে আসা নারীদের অন্তর্ভুক্তি সংসদে বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রতিনিধিত্বের সম্ভাবনা তৈরি করে। বিশেষ করে প্রান্তিক নারীদের সামনে এগিয়ে আসার সুযোগ তৈরি হলে এই ব্যবস্থা সত্যিকার অর্থেই একটি প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই অংশগ্রহণ কি যথেষ্ট, এবং তারা কি দলীয় কাঠামোর বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন?

সংরক্ষিত নারী আসন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এসব আসনে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচন হয় না। দলীয় মনোনয়নই এখানে প্রধান নির্ধারক। ফলে এসব নারী সংসদ সদস্যের জবাবদিহিতা জনগণের প্রতি নয়, বরং দলের প্রতি বেশি থাকে। এতে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন না হয়ে দলীয় নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত ক্ষমতায়ন তখনই সম্ভব যখন নারীরা সরাসরি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ভোটের মাধ্যমে সংসদে আসতে পারবেন এবং নিজেদের রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে পারবেন। সংরক্ষিত আসন সেই পথে একটি সেতুবন্ধন হতে পারত, যদি মনোনয়ন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক এবং গণমুখী হতো। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এটি অনেক সময়েই ‘টোকেন প্রতিনিধিত্ব’-এ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যরা সংসদে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছেন? শুধু নারী সদস্য সংখ্যা বাড়লেই ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্রিয় অংশগ্রহণ, আইন প্রণয়নে প্রভাব বিস্তার এবং স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগ। যদি তারা শুধুমাত্র দলীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের যন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হন, তবে সংরক্ষিত নারী আসনের উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
এই বাস্তবতায় সংরক্ষিত নারী আসন ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন জরুরি হয়ে উঠেছে। সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে সংরক্ষিত আসনে নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা, দলীয় মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা এবং নারী নেতৃত্ব বিকাশে প্রশিক্ষণ ও রাজনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ বাড়ানো—এসব উদ্যোগ সময়ের দাবি।
সংরক্ষিত নারী আসন নিঃসন্দেহে একটি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ, বিশেষত পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য। তবে এটি যেন কেবল প্রতীকী উপস্থিতি না হয়ে সত্যিকার অর্থে নারীর ক্ষমতায়নের হাতিয়ার হয়—এই লক্ষ্য অর্জন করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ক্ষমতায়ননারীপ্রতিনিধিত্ব