বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬
নারী

এখনও থামেননি নুয়েন

1775499187-5a4894f0aecb6ea0918f39a17558d766

ধর্ষণ শব্দটি আমরা হরহামেশাই এখন শুনে থাকি। ধর্ষণ অভিধানভুক্ত একটি বাংলা শব্দ হলেও এর ভয়াবহতার পরিমাণ কতটুকু, সেটি ভুক্তভোগী ছাড়া আর কারো পক্ষে ঠাহর করা কঠিন। নুয়েন ধর্ষিত হয়েছিলেন তার ডরমেটরি কির্কল্যান্ড হাউসের সামনে। স্নাতক সম্পন্ন করতে মাত্র তিন মাস বাকি ছিল। আঠারোতে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসায় করেছেন ইন্টার্নশিপ।মহাকাশচারী হয়ে দুর্ধষ মহাকাশযাত্রা করার স্বপ্ন পূরণের খুব কাছে ছিলেন তিনি। কিন্তু এর আগেই জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন তিনি।

ধর্ষণের পর হাসপাতালে তিনি যখন নরক যন্ত্রণা সহ্য করছিলেন, তখন তিনি উপলব্ধি করেন নারীর প্রতি এমন সহিংসতার জন্য কেবল ব্যক্তি নয়, দেশের আইনব্যবস্থাও সমান দায়ী। প্রথম ধাক্কা পান যখন জানতে পারেন ধর্ষণের আলামত সংগ্রহ ও পরীক্ষার জন্য যে কিট ব্যবহার করা হয়, সেটির খরচ তাকেই বহন করতে হবে। ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যে ধর্ষণের বিরুদ্ধে মামলা করার সময়সীমা ১৫ বছর। কিন্তু ধর্ষকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ সেই কিটটি আলামত সংগ্রহের ছয় মাস পরেই ধ্বংস করে ফেলা হয়। অথচ এসব আলামত সংগ্রহ করতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার নারীকে কঠিন ও প্রচণ্ড কষ্টদায়ক কিছু পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়।হাসপাতাল তাকে ছাড়পত্র দেয়। সঙ্গে দেয় প্রায় পাঁচ লাখ ডলারের বিল। নুয়েন তখন শারীরিকভাবে অসুস্থ, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। পাশাপাশি এই দুর্বল ও অযৌক্তিক ব্যবস্থা তাঁকে ভেতর থেকে একটু একটু করে শেষ করে দিচ্ছে। তবে এই ক্ষোভই যেন তাকে লড়াই করার দৃঢ় মানসিকতার জোগান দেয়। নুয়েন বলেন, ‘সিস্টেমটা আমার বিরুদ্ধেই সাজানো মনে হচ্ছিল আর সেটা আমার কাছে ধর্ষণের চেয়েও বড় বিশ্বাসঘাতকতা মনে হয়েছিল।’

এরপরে একসময়ে নিজেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে ফেলা নুয়েন আবারও ঘুরে দাঁড়ান। কেবল নিজের জন্য নয়, ধর্ষণের শিকার সব নারীর জন্য। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানের ধর্ষণের শিকার নারীদের নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে আন্দোলন ‘রাইজ’ গড়ে তোলেন। পাশাপাশি ‘যৌন নির্যাতনের ভুক্তভোগীদের অধিকার সনদ’ গঠন ও বাস্তবায়নের কাজে লেগে পড়েন। ১৫ বছরের মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিট ধ্বংস না করা এবং নির্যাতিতাকে এই কিট বাবদ কোনো অর্থ পরিশোধ না করার বিষয়ও সনদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ধীরে ধীরে তিনি নিজের জীবনকে গুছিয়ে নিতে শুরু করেন। স্নাতক সম্পন্ন করেন। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ যোগদানের নানা ধাপ পার করেন। পাশাপাশি নিজের রেইপ কিটটি খুঁজে বের করার মিশনে নেমে পড়েন। যে করেই হোক, ছয় মাসের মধ্যে তাকে কিটের সন্ধান পেতেই হবে। তিনি ফরেনসিক ল্যাবগুলোতে ফোন করতেন, ই-মেইল করতেন, কিটের অবস্থান খুঁজে বের করার চেষ্টা করতেন। শেষমেশ তিনি কিটটি খুঁজে পান এবং তাঁর অনুরোধে ল্যাব কর্তৃপক্ষ কিট ধ্বংস করার সময়সীমা বাড়াতে রাজি হয়।

নুয়েন তখনো ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তবু তিনি হার মানেননি। প্রচণ্ড মানসিক দৃঢ়তার পাশাপাশি তিনি তার কিছু বন্ধুকে পাশে পেয়েছেন। কেউ ওয়েবসাইট তৈরি করতে চায়, কেউ অর্থনৈতিক বিষয়ে হিসাব করতে চায়। হার্ভার্ডের একটি আইন দল বিলের খসড়া তৈরিতে সাহায্য করে। কিন্তু দেশ হোক বা পাশ্চাত্য সমাজ হোক, ধর্ষণের শিকার নারীদের ‘ভিকটিম ব্লেমিং’ দুই স্থানেই বর্তমান। নুয়েনকেও তা সহ্য করতে হয়েছে। নুয়েনের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছিল নির্যাতিতা ও তাদের পরিবারের বার্তাগুলো। প্রতিটি গল্প ছিল হৃদয়বিদারক। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নারীরা তাদের নিজস্ব গল্প পাঠিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি আইন পাসের লক্ষ্যে সিআইএর আবেদনও প্রত্যাহার করে নেন। অবশেষে তিনি এই আন্দোলনে সফল হন।

কংগ্রেসে এই বিল সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। যদিও সিনেট বিচার বিভাগের সিনিয়র কাউন্সিলর প্রস্তাব দিয়েছিলেন এর নাম ‘আমান্ডা’স ল’ রাখার জন্য, নুয়েন চেয়েছিলেন এটি যেন সব ভুক্তভোগীর প্রতিনিধিত্ব করে। ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এটিতে ফেডারেল আইনে স্বাক্ষর করেন। ধীরে ধীরে রাইজ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গরাজ্যে একই সুরক্ষা নিশ্চিতে কাজ করতে শুরু করে। গত এক দশকে তারা ৯১টি আইন পাস করাতে সক্ষম হয়েছে এবং এখন তারা একটি আন্তর্জাতিক চুক্তির জন্যও কাজ করছে, যা ধর্ষণ মামলায় সার্বজনীন বিচারিক ক্ষমতা নিশ্চিত করবে।

২০১৯ সালে নুয়েন নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন। ২০২২ সালে টাইম ম্যাগাজিনের বর্ষসেরা নারীদের একজন হন। ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল নুয়েন প্রথম ভিয়েতনামি নারী মহাকাশচারী হিসেবে ব্লু অরিজিনের নিউ শেপার্ড রকেটে করে মহাকাশের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমানা অতিক্রম করেন। মহাকাশে তার একটি গবেষণার বিষয় ছিল রক্তপাত ও ঋতুচক্র নিয়ে। ভিন্ন ভিন্ন অভিকর্ষজ ত্বরণে তরল শোষণের আচরণ নিয়ে। নুয়েন বলেন, ‘ইতিহাসে নাসা নারীদের মহাকাশচারী হতে বাধা দিয়েছিল, আর এর অন্যতম কারণ হিসেবে তারা ঋতুচক্রের বিষয়টি উল্লেখ করেছিল। এ কারণেই আমি এটা করেছি।’ ৩৪ বছর বয়সী নুয়েন এখনো লড়ে যাচ্ছেন ধর্ষণের শিকার নারীদের পক্ষে। লিখেছেন স্মৃতিকথা ‘সেভিং ফাইভ’।

ধর্ষণনারীনুয়েনমহাকাশচারী