বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ১০ জুন, ২০২৬
নারী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০৫ বছরের ইতিহাসে ম্রো সম্প্রদায়ের প্রথম নারী শিক্ষার্থী য়াপাও ম্রো

aa92541b57e4359b210f841d9f6fc53e-69e4742e12c0d

বান্দরবানের রুমা উপজেলার দুর্গম একটি গ্রাম নিশিপাড়া। এটি রুমা উপজেলার ৩ নম্বর রেমাক্রি প্রাংসা ইউনিয়নের অন্তর্গত। বান্দরবান সদর থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই গ্রাম চারদিকে পাহাড় আর জঙ্গলে ঘেরা। এখানকার মানুষের প্রতিদিন প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বাঁচতে হয়। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা প্রায় নেই বললেই চলে। বিদ্যুৎ, মোবাইল নেটওয়ার্ক, সুপেয় পানি বা হাসপাতাল—কিছুই সহজলভ্য নয়। তবে এই অভাবের মধ্যেও তাদের জীবনের অবলম্বন প্রকৃতিই।

প্রকৃতির এ রূঢ় বাস্তবতার মধ্যে বেড়ে উঠা য়াপাও ম্রোর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়া শুধুমাত্র তার একার সাফল্য নয়, বরং এটি পুরো ম্রো জাতিগোষ্ঠির এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। এ ঘটনা ম্রোদের জন্য যেমন গৌরবের, তেমনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যও সম্মানের। অবশ্য এই কৃতিত্ব অর্জনে অদম্য এই তরুণীকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ম্রো জনগোষ্ঠীর কোনো তরুণী হিসেবে ভর্তি হয়েছেন বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি গ্রাম নিশিপাড়া থেকে উঠে আসা য়াপাও ম্রো। ১০৫ বছর হতে চলল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স। ঢাবি প্রতিষ্ঠার পর শতবর্ষ পেরিয়ে এই প্রথম দেশের ম্রো জনগোষ্ঠীর কোনো তরুণী সুযোগ পেলেন এখানে।

বান্দরবানে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংখ্যায় ম্রোদের অবস্থান দ্বিতীয়। ম্রোরা বান্দরবান জেলার দ্বিতীয় বৃহত্তম জাতিসত্তা। বান্দরবান জেলার লামা, আলীকদম, থানছি ও নাইক্ষ্যংছড়িতে মূলত ম্রোদের বসবাস। এ জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের একটা বড় অংশ পাহাড়ের প্রথাগত জুম চাষের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু পাহাড়ের অন্য নৃগোষ্ঠীর তুলনায় তারা অনগ্রসর। জুমচাষনির্ভর এই নৃগোষ্ঠীর বেশির ভাগই লিখতে-পড়তে পারে না।

বান্দরবানের রুমা উপজেলার রেমাক্রি প্রাংসা ইউনিয়নের নিশিপাড়া কঠিন বাস্তবতায় ঘেরা। পাহাড়ি এই গ্রামে আজও বিদ্যুৎ, সুপেয় পানি, হাসপাতাল কিংবা স্থায়ী যোগাযোগব্যবস্থা নেই। জুমচাষ নির্ভর জীবিকা এবং সীমিত শিক্ষার সুযোগের মধ্যে বেড়ে ওঠা ম্রো জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগই এখনও লেখাপড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত।

ম্রো ভাষার গবেষক ইয়াংঙান ম্রো বলেন, এতদিন ম্রো সমাজে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া কোনো তরুণীর উদাহরণ ছিল না। য়াপাও সেই অচলায়তন ভেঙেছেন। তাঁর মতে, এটি শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং পুরো জাতির আত্মবিশ্বাস জাগানোর ঘটনা।

চার ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয় য়াপাওয়ের বাবা পারাও ম্রো একজন দরিদ্র জুমচাষি। নিজের জীবনে শিক্ষা না পেলেও সন্তানদের জন্য আলোর স্বপ্ন দেখতেন তিনি। কষ্টের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বারবার মেয়েকে বলতেন, ‘আমরা তো চোখ থাকতে অন্ধ ছিলাম, তুই আমাদের আলো হবি।’

দারিদ্র্য, অনগ্রসরতা, কষ্ট ও সীমাহীন প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে তাঁর এই অর্জন পাহাড়ের প্রতিটি ম্রো কিশোরীর জন্য হবে নতুন স্বপ্নের অনুপ্রেরণা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়প্রথমম্রো সম্প্রদায়য়াপাও ম্রোশিক্ষার্থী