‘আমরা তোমাকে কিনে এনেছি, যেতে চাইলে ১৫০০ রিয়াল দাও’-মধ্যপ্রাচ্যে নারী শ্রমিকদের অমানবিক বাস্তবতা

স্বামী ছেড়ে যাওয়ার পর দুই সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে রহিমা (ছদ্মনাম) বেছে নিয়েছিলেন বিদেশে কাজের উদ্দেশ্যে যাওয়ার কঠিন পথ। দালালের আশ্বাস ছিল— সৌদি আরবে ‘অফিস জব’, বেতন মাসে ১ হাজার ৪০০ রিয়াল। জীবনের নতুন আশার আলোর খোঁজে ২০২০ সালে নরসিংদী থেকে রিয়াদের উদ্দেশে পাড়ি জমান তিনি। কিন্তু সৌদি আরবে পৌঁছানোর পরই ভেঙে পড়ে সেই স্বপ্ন।
অফিসের চাকরির বদলে রহিমাকে পাঠানো হয় এক বিশাল প্রাসাদে। সেখানে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে বাধ্য করা হয় তাকে, মাসিক বেতনও কমিয়ে দেওয়া হয় ১ হাজার ১০০ রিয়ালে। দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম, অপমান, অনাহার— সব মিলিয়ে তার জীবন হয়ে ওঠে যেন বন্দিদশার আরেক নাম।
কাজের নামে নির্যাতন, বিশ্রামের সুযোগ নেই
৪০ বছর বয়সী রহিমা জানান, তাকে প্রতিদিন রাত ১টা পর্যন্ত কাজ করতে হতো। সামান্য বিশ্রাম নিলেই গৃহকর্ত্রী শুরু করতেন গালিগালাজ আর চিৎকার। খাবারের নামে দেওয়া হতো অল্প কিছু, অনেক সময় উচ্ছিষ্ট খাবার খেয়েই কাটাতে হতো দিন।
রহিমা বলেন, ‘একদিন ক্ষুধা সহ্য করতে না পেরে বাইরে থেকে খাবার কিনে আনি। তারা সেটা জানতে পেরে আমাকে মারধর করে এবং এক সপ্তাহ তালাবদ্ধ করে রাখে। প্রায় না খেয়েই থাকতে হয়েছিল।’
চিকিৎসার বদলে বাধ্যতামূলক শ্রম
কাজ করতে গিয়ে একদিন পর্দা পরিষ্কার করার সময় উঁচু টুল থেকে পড়ে রহিমার পা গুরুতরভাবে জখম হয় এবং ঠোঁট কেটে যায়। কিন্তু চিকিৎসা তো দূরের কথা, মালিকপক্ষ শুধু ব্যথানাশক ওষুধ দিয়ে আবার কাজে লাগিয়ে দেয় তাকে।
অবস্থা আরও খারাপ হলে রহিমা দেশে ফেরার আকুতি জানান। কিন্তু তখনই সামনে আসে ভয়ংকর বাস্তবতা। নিয়োগকর্তা তাকে রিক্রুটিং এজেন্টের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেন।
সেই এজেন্ট স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয়—
‘আমরা তোমাকে কিনে এনেছি, যেতে চাইলে ১ হাজার ৫০০ রিয়াল দিতে হবে।’
টাকা দিতে না পারায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়েই আরও কয়েক মাস কাজ করতে বাধ্য হন রহিমা। মানসিকভাবে ভেঙে পড়া এই নারী শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন এবং ২০২৩ সালে দেশে ফেরেন। তবে শেষ দুই মাসের বেতন তিনি আর পাননি।
শুধু একটি ঘটনা নয়, হাজারো নারীর গল্প
রহিমার ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যে নারী শ্রমিকদের ওপর চলমান কাঠামোগত নির্যাতনের একটি বাস্তব প্রতিচ্ছবি। নির্যাতন, খাদ্যাভাব, অতিরিক্ত কাজ, বেতন না দেওয়া, শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন— এসব যেন বহু নারী শ্রমিকের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) কাছে নির্যাতিত নারী শ্রমিকদের নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। তবে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্যমতে, ২০১৯ সাল থেকে দেশে ফিরেছেন অন্তত ৬৯ হাজার ৯০ জন নারী শ্রমিক। তাদের বড় একটি অংশ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে ধারণা করা হয়।
বাড়ছে মৃত্যু সংখ্যাও
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্যমতে, গত আট বছরে ৭৯৯ জন নারী শ্রমিকের মরদেহ দেশে ফিরেছে। অধিকাংশ মৃত্যুসনদে উল্লেখ করা হয়েছে ‘আত্মহত্যা’। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের সন্দেহ— অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবতা গোপন থেকে যায়।
অভিযোগ হয়, বিচার হয় না
২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিএমইটিতে নারী শ্রমিকদের জমা পড়েছে ২ হাজার ৩৬টি অভিযোগ। এর মধ্যে অধিকাংশ অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে বলা হলেও অভিযুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর শাস্তির ঘটনা খুবই কম। গত বছর ১১০টি এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও মাত্র ১৪টিকে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশাসনিক জটিলতা, প্রমাণের অভাব এবং দূতাবাসের সীমিত সক্ষমতার কারণে অনেক অভিযোগই ধামাচাপা পড়ে যায়। অনেক নারী গৃহকর্মী হিসেবে একা থাকেন, তাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। ফলে বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে তারা।
রাষ্ট্রের নজর রেমিট্যান্সে কিন্তু অধিকার উপেক্ষিত
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ মামুন উর রশিদ বলেন, রাষ্ট্র যখন শুধু রেমিট্যান্সের দিকে নজর দেয়, তখন এই শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা উপেক্ষিত থাকে। ডাক্তার বা উচ্চপদস্থ কর্মীরা আন্তর্জাতিক প্রটোকল অনুযায়ী সুরক্ষা পেলেও সাধারণ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে তা বাস্তবে দেখা যায় না।
ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, ‘নারী শ্রমিকরা পালানোর চেষ্টা করলে মালিকরা অনেক সময় তাদের বিরুদ্ধে চুরির মামলা দিয়ে দেয়। ফলে দূতাবাসগুলো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার চেয়ে দ্রুত দেশে ফেরত পাঠাতেই বেশি আগ্রহী হয়।
’
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ সরকারের কূটনৈতিক নীতির সমালোচনা করে বলেন, ‘যেভাবে পারো যাও, যেকোনো কাজ করো এবং ডলার পাঠাও— এটি একটি রাষ্ট্রের নীতি হতে পারে না।’
সরকারের দাবি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে
অন্যদিকে প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নূরুল হক নূর জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। তিনি বলেন, সৌদি আরবে নারী শ্রমিকদের আইনি সহায়তার জন্য দুটি ল ফার্ম নিয়োগ করা হয়েছে। এছাড়া রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নতুন গ্রেডিং সিস্টেম চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
শেষ কথা
রহিমার গল্প শুধু একজন নারীর নয়— এটি হাজারো স্বপ্নভাঙা অভিবাসী নারীর নিঃশব্দ কান্নার প্রতিচ্ছবি। যারা পরিবার বাঁচাতে বিদেশে যান, তারা যেন সেখানে গিয়ে মানুষের মতো বাঁচার অধিকারও হারিয়ে ফেলেন।
একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—
বিদেশে কাজ করতে যাওয়া নারী শ্রমিকরা কি কেবল রেমিট্যান্স আনার যন্ত্র, নাকি তারা এই দেশের নাগরিক, যাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব?



