ইমেরা থেকে মালিহা: ‘পরিত্যক্ত’ থেকে যেভাবে ‘রাজকন্যা’র মতো বেড়ে উঠছে

ছোটমণি নিবাসে থাকার সময়ই আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মালিহার জীবনে আসে বড় পরিবর্তন। ঢাকার পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে ১৮৯০ সালের অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন এবং ২০২৩ সালের পারিবারিক আদালত আইনের আওতায় তার অভিভাবকত্ব দেওয়া হয় ফার্মাসিস্ট সামশাদ সুলতানা খানমকে।
কন্যাশিশুর নাম ইমেরা সারার, যাকে সবাই আদর করে ডাকেন ‘ইমু পাখি’ ও ‘ময়না পাখি’ নামে। বয়স আনুমানিক দেড় বছর। ‘আনুমানিক’ বলা হচ্ছে, কারণ জন্মের পরপরই তাকে রাস্তায় ফেলে যাওয়া হয়েছিল। পরে ‘পরিত্যক্ত’ হিসেবে সরকারের ছোটমণি নিবাসে আশ্রয় পায় এই শিশু, নাম দেওয়া হয় মালিহা। সেই শিশুই এখন ইমেরা সারার নামে রাজকন্যার মতোই বড় হচ্ছে ফার্মাসিস্ট সামশাদ সুলতানার পরিবারে।
গত বছরের ২১ মে পাওয়া এই আইনি স্বীকৃতির পর মালিহার নতুন নাম হয়—ইমেরা সারার। অভিভাবক সনদে উল্লেখ করা হয়, তার জন্ম আনুমানিক ২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর। সামশাদই এখন তার আইনগত অভিভাবক, যিনি তাকে শরীর ও জীবনের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন।
৮ এপ্রিল রাজধানীর মিরপুরের উত্তর পীরেরবাগে সামশাদ সুলতানার মা মাহমুদা বেগমের বাসায় কথা হয় তাঁদের সঙ্গে। সামশাদ সুলতানা শুনিয়েছেন পরিত্যক্ত শিশু থেকে রাজকন্যা হয়ে ওঠা ইমেরার জীবনের গল্প। সামশাদ বলেন, সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত ছোটমণি নিবাসে ইমেরার নাম ছিল মালিহা। সন্তানের জন্মের পর অন্য পরিবারের মতোই তাঁর পরিবারের সদস্যরা ঘটা করে শিশুটির নাম রাখেন ইমেরা সারার। ইমেরা এখন আধো আধো কথা বলা শিখেছে। নিজে থেকেই সে সামশাদকে বাবা আর নানি মাহমুদা বেগমকে দাদা বলে ডাকে।
সামশাদ সুলতানা বলেন, ‘আমিও আমার বাবাকে আব্বা আর মাকে বাবা ডাকি। আমার মেয়েও আমাকে বাবা ডাকে। অবিবাহিত আমিই ওর মা, আমিই ওর বাবা। ওকে গর্ভে নয়, ব্রেনে ধারণ করেছি।’
সামাজিক নিয়ম রক্ষায় প্রতীকী হিসেবে ইমেরার বাবার নামের জায়গায় মুহাম্মদ আবদুল্লাহ নামটি উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সামশাদ। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো ‘আল্লাহর বান্দা’ বা ‘আল্লাহর দাস’। ভবিষ্যতে কোনো আবদুল্লাহ সত্যি সত্যি জীবনে এলে ইমেরার সবকিছু জেনেই তিনি আসবেন।
সমাজের প্রচলিত ধারণা ভেঙে সামশাদ সুলতানা স্পষ্ট করে বলেন, ইমেরার পরিচয় তিনি কখনো গোপন করবেন না। সামাজিক বাস্তবতায় এ ধরনের পরিত্যক্ত শিশুদের অভিভাবকত্ব পাওয়া অধিকাংশ মা–বাবা বিষয়টি গোপন করেন। সমাজের অনেকেই এমন বাচ্চাদের ধর্ম, বংশ ও মা–বাবা নিয়ে নানা প্রশ্ন তোলে। তিনি পরিচয় গোপন করার এই ‘ট্যাবু’ ভাঙতে চান। চান, ইমেরার মতো শিশুরা যেন সমাজে অচ্ছুত না হয়।
সামশাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি অ্যান্ড ফার্মাকোলজি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর শেষে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করেছেন। বর্তমানে তিনি স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের আন্তর্জাতিক বিপণন বিভাগের ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করছেন। সামশাদ এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকার ২০টির মতো দেশে ভ্রমণ করেছেন। জাপানিজ, ফ্রেঞ্চ, আরবি ভাষা শিখেছেন। তাঁর তিনটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। অবসর সময়ে তিনি ফেসবুকে নিয়মিত ইমেরাকে নিয়ে লেখালেখি করেন।
ইমেরা কীভাবে ভালো থাকবে, তা নিয়েই সামশাদের পরিবারের সবাই ব্যস্ত থাকেন এখন। আর অন্য নানিদের মতোই ইমেরার পেছনে ঘুরঘুর করে দিনের বেশির ভাগ সময় কাটে সামশাদের মা মাহমুদা বেগমের। ইমেরার অভিভাবকত্ব নেওয়ার আগে পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী, আলেমসহ নানা মানুষের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে জানিয়েছেন সামশাদ। তিনি বলেন, অবিবাহিত একজন নারীর জন্য একটি শিশুর দায়িত্ব নেওয়ার সিদ্ধান্ত খুব একটা সহজ ছিল না। আর ইমেরা তার আশপাশের এই মানুষগুলোর মধ্যেই বড় হবে।
অবিবাহিত হয়েও একটি শিশুর মা হয়ে ওঠার পেছনে পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে সামশাদ বলেন, ইমেরাকে নেওয়ার জন্য আইনি আবেদনে জিম্মাদার ছিলেন তাঁর বড় বোন খুলনা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক সাবেরা সুলতানা খানম। আর সুইডেন থেকে উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে ফেরা ছোট বোন সানজিদা সুলতানা খানম তখন নতুন মা হয়েছেন। ইমেরার দুধমা হিসেবে তিনিই বুকের দুধ খাওয়ান। সামশাদ অফিসের কাজে দেশের বাইরে গেলে ইমেরাকে দেখে রাখার জন্য সাভারে থাকা সানজিদার ডাক পড়ে ঢাকায়।
মেয়ের পাসপোর্ট করা, স্কুলে ভর্তি করাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেই হয়তো নানা প্রতিবন্ধকতা পোহাতে হবে উল্লেখ করে সামশাদ বলেন, ‘মেয়েকে মানসিকভাবে শক্তপোক্ত করে বড় করব, যাতে যেকোনো পরিস্থিতিতে সে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। ইমেরা নামের অর্থ নেতা, আর সারার মানে হচ্ছে খাঁটি। আমি চাই, মেয়ে বড় হয়ে নেতৃত্ব দেবে।’
মেয়ের উদ্দেশ্যে লেখা একটি চিঠি গত বছরের নভেম্বরে ফেসবুকে পোস্ট করেছেন সামশাদ। ওই চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘বড় হয়ে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে করতে শুনবে, তারা কেউ ৮ কিংবা ৯ অথবা ১০ মাস তাদের মায়ের উদরে বেড়ে উঠেছে। তুমি তখন সগৌরবে নিজের গল্প শোনাবে।…একটাই অনুরোধ থাকবে, জীবনে চলার পথে অসত্য, অন্যায় আর অহমিকাকে কখনো প্রশ্রয় দিয়ো না। অন্তর থেকে জন্ম নেওয়া মানবশিশু তুমি, সারাটা জীবন সবার অন্তরের আলো হয়ে থেকো।’



