অদৃশ্য আতঙ্ক ‘হাম’: জানুন ঝুঁকি ও সুরক্ষার উপায়

শহরের হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র কিংবা পাড়ার ক্লিনিক—সবখানেই এখন এক পরিচিত দৃশ্য। কোলে জ্বরাক্রান্ত শিশু, শরীরে লালচে র্যাশ, উদ্বিগ্ন বাবা-মায়ের ছুটে চলা। অনেকেই ভাবছেন, হয়তো সাধারণ ভাইরাল জ্বর। কিন্তু চিকিৎসকেরা বলছেন—এই লক্ষণগুলোর বড় অংশই হাম।
একসময় প্রায় নিয়ন্ত্রণে থাকা এই রোগ কেন আবার ফিরে আসছে? কেন এত দ্রুত ছড়াচ্ছে? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—শিশুর হাম হলে কী করবেন?
হাম কী?
হাম বা মিসেলস্ একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। হাম শুরু হয় খুব সাধারণ কিছু উপসর্গ দিয়ে—জ্বর, কাশি, সর্দি, চোখ লাল হওয়া। অভিভাবকেরা অনেক সময় এটিকে মৌসুমি ঠান্ডা বা ভাইরাল সংক্রমণ ভেবে অবহেলা করেন। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়।
মুখ থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে লালচে র্যাশ। তখনই বোঝা যায়—এটি সাধারণ জ্বর নয়, বরং এক সংক্রামক ভাইরাসের আক্রমণ।
এই ভাইরাসটি হলো রুবেলা ভাইরাস, যা শ্বাসনালির মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে এবং খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শিশুর ক্ষেত্রে এটি রোগ প্রতিরোধক্ষমতা সাময়িকভাবে নষ্ট করে দেয়। এর ফলে হামে আক্রান্ত হলে শিশু এর বাইরেও নানা রকম ব্যাকটেরিয়া এবং অন্যান্য জীবাণু দ্বারা সহজে সংক্রমিত হয়।
কীভাবে ছড়ায়?
হাম আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে বাতাসে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। সেই বাতাসে থাকা ভাইরাস অন্য কেউ শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করলে সংক্রমিত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন আক্রান্ত ব্যক্তি ৮–১০ জন সুস্থ মানুষকে সংক্রমিত করতে পারেন- যা এই রোগের উচ্চ সংক্রামক ক্ষমতার প্রমাণ।
কতটা মারাত্মক হাম?
হামকে শুধু ‘শিশুর রোগ’ ভেবে হালকা করে দেখা ঠিক নয়। কারণ এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, এমনকি মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্ট শিশু বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের ক্ষেত্রে এটি প্রাণঘাতী হতে পারে। শিশুর কানপাকা, মুখে ঘা, মারাত্মক অপুষ্টি, মস্তিষ্কের প্রদাহসহ আরও অনেক রকম জটিলতা দেখা দিতে পারে।
এ ছাড়া হামে আক্রান্ত শিশুর শরীরে ভিটামিন এ–এর মজুত মারাত্মকভাবে কমে যায়। এর ফলে শিশুর চোখের পানি কমে যায় বা চোখ শুষ্ক হয়ে যায়, এ থেকে রাতকানা থেকে শুরু করে অন্ধত্ব পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, টিকা না নেওয়া শিশুদের মধ্যে হাম এখনও মৃত্যুর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
কীভাবে সাবধান থাকবেন?
১. টিকা হলো হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী এমএমআর (মিসেলস্, মাম্পস্, রুবেলা) টিকা নিশ্চিত করা জরুরি।
২. এছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তির কাছ থেকে দূরে থাকা, হাঁচি-কাশির সময় মুখ ঢেকে রাখা, হাত ধোয়ার অভ্যাস বজায় রাখা, শিশুকে ভিড় এড়িয়ে রাখা – এসবও সংক্রমণ কমাতে সাহায্য করে।
৩. যদি কোনো শিশুর জ্বরের সঙ্গে র্যাশ দেখা যায়, সাধারণ র্যাশ ভেবে দেরি করবেন না। দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিন।
অভিভাবকের করণীয়
কোনো শিশুর জ্বর এবং শরীরে র্যাশ দেখা দিলে তা হাম হোক বা না হোক, চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। শিশুর শরীরে র্যাশ দেখা দেওয়ার দিন থেকে অন্তত পাঁচ দিন অন্যদের কাছ থেকে আলাদা রাখতে হবে। এ সময় আক্রান্ত শিশুর খাবার, পানীয় ও অন্যান্য স্বাভাবিক পরিচর্যা অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিকসহ তাকে পরপর দুই দিন দুটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ভিটামিন এ ক্যাপসুল বয়স অনুযায়ী সঠিক ডোজে খাওয়াতে হবে।
হামে আক্রান্ত শিশুর যদি কোনো বিপদচিহ্ন, যেমন শ্বাসকষ্ট, বারবার বমি, খিঁচুনি বা নিস্তেজ হয়ে পড়া, চোখের মণি ঘোলা হয়ে আসে বা মুখের ভেতর গভীর ঘা থাকে, তাহলে দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে। সেখানে শিশুকে আলাদা ওয়ার্ডে বা কেবিনে রেখে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে হবে।
যদি হামে আক্রান্ত কোনো শিশুর দৃষ্টি সমস্যা বা দেখতে অসুবিধা হয়, কিংবা চোখের মণি ঘোলা লাগে, তাহলে ১৪ দিনের মাথায় আরও একটা ভিটামিন এ ক্যাপসুল (মোট ৩টি) দিতে হবে।
তবুও জরুরি সচেতনতা
হাম খুব দ্রুত ছড়ায়, তাই একজন আক্রান্ত শিশুর মাধ্যমে একটি পুরো পরিবার বা স্কুল আক্রান্ত হতে পারে। অনেক সময় দেরিতে শনাক্ত হওয়ায় সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা গ্রহণের হার কমে গেলে বা অবহেলা বাড়লে এমন সংক্রমণ হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে। তাই সচেতনতা বাড়ানোই এখন সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ।
হাম প্রতিরোধযোগ্য রোগ- কিন্তু অবহেলায় তা মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে।



