১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | রবিবারবাংলা: ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
বিবিধ

রানা প্লাজা থেকে বেঁচে ফিরলেও পদ্মায় বাসডুবিতে হারিয়ে গেলেন নাসিমা

রানা প্লাজা থেকে বেঁচে ফিরলেও পদ্মায় বাসডুবিতে হারিয়ে গেলেন নাসিমা

জীবন কার কোথায় থমকে যাবে, তার কোনো পূর্বাভাস নেই। কখনো তা অলৌকিকভাবে কাউকে ফিরিয়ে আনে মৃত্যুর দুয়ার থেকে, আবার কখনো বিনা নোটিশেই কেড়ে নেয় সবকিছু। নাসিমা বেগমের জীবন যেন সেই নির্মম অনিশ্চয়তারর কথাই মনে করিয়ে দেয়—যেখানে বেঁচে ফেরার গল্পও শেষ পর্যন্ত হার মানে নিয়তির কাছে।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল—বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ভয়াবহ দিন। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি-এর ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে ছিলেন হাজারো শ্রমিকের মতো নাসিমাও। মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে টানা ৭২ ঘণ্টা পর জীবিত উদ্ধার হন তিনি। সেই সময় তার নাম হয়ে উঠেছিল আশার প্রতীক—ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকেও জীবন ফিরে পাওয়ার এক বিস্ময়কর গল্প।

কিন্তু বারো বছর পর, সেই জীবনই থেমে গেল আরেক দুর্ঘটনায়—নদীর অন্ধকার জলে।

দিনাজপুরের পার্বতীপুরের এক সাধারণ গৃহবধূ নাসিমা বেগমের জীবন ছিল সংগ্রামের। স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে বাধ্য হন তিনি। জীবিকার সন্ধানে গত ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার সাভারে আসেন। এক মাস চেষ্টা করেও কোনো কাজ জোটেনি। তবু হাল ছাড়েননি—কারণ জীবন থেমে থাকার সুযোগ দেয় না।

ঈদের সময় আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করতে ফরিদপুরে যান তিনি। কিন্তু ঈদের আনন্দ শেষ হতেই আবার শুরু হয় বাস্তবতার টানাপোড়েন। ২৫ মার্চ বিকেলে ঢাকায় ফেরার উদ্দেশ্যে বাসে ওঠেন নাসিমা—সঙ্গে ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা ভাগনি, তার স্বামী ও ছোট্ট শিশু।

কেউ জানত না, সেটিই হবে তাঁদের শেষ যাত্রা।

রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ফেরিঘাট এলাকায় ঘটে যায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা। চলন্ত বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে যায় পদ্মা নদী-এর পানিতে। মুহূর্তেই সবকিছু বদলে যায়—হাসি, গল্প, স্বপ্ন—সব ডুবে যায় নদীর গভীরে।

কিছুক্ষণ পর ভাগনির স্বামী জীবিত উদ্ধার হলেও বাকিরা আর ফিরতে পারেননি। প্রায় ছয় ঘণ্টা পর উদ্ধার করা হয় নাসিমা বেগমের নিথর দেহ। যে নারী একসময় ধ্বংসস্তূপের নিচে তিন দিন থেকেও জীবন আঁকড়ে ধরেছিলেন, তিনি এবার নদীর জলে হার মানলেন মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে।

দুর্ভাগ্য যেন নাসিমার পরিবারকে ছাড়েনি মৃত্যুর পরও। লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স বাড়ি ফেরার পথে কুষ্টিয়ায় আবারও দুর্ঘটনার শিকার হয়। যদিও বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি, তবু ঘটনাটি যেন এই পরিবারের ওপর নেমে আসা দুর্ভাগ্যেরই আরেক প্রতিচ্ছবি।

পার্বতীপুরের মধ্য আটরাই গ্রামে এখন শুধুই শোকের ছায়া। একসঙ্গে কয়েকজন স্বজনকে হারিয়ে স্তব্ধ পুরো পরিবার। যে নারী একসময় মৃত্যুকে হারিয়ে ফিরেছিলেন, তার এমন পরিণতি কেউ মেনে নিতে পারছেন না।

স্থানীয় প্রশাসন পরিবারটিকে সামান্য সহায়তা দিয়েছে, সমবেদনা জানিয়েছে। কিন্তু এই ক্ষতি কি কোনোভাবে পূরণ সম্ভব?

নাসিমা বেগমের গল্প আমাদের সামনে এক কঠিন সত্য তুলে ধরে—জীবন সবসময় ন্যায়সংগত নয়। কখনো বেঁচে যাওয়াও শেষ রক্ষা নয়। মানুষ বাঁচার জন্য লড়াই করে, কিন্তু শেষ সিদ্ধান্তটা সবসময় মানুষের হাতে থাকে না।

Advertisements