বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ২০ মে, ২০২৬
বিনোদন

৩৮ বছরের ‘ইত্যাদি’ কতটা মন ভরাতে পারল

৩৮ বছরের ‘ইত্যাদি’ কতটা মন ভরাতে পারল

ঈদ মানেই বিশেষ আয়োজন আর সেই আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ ‘ইত্যাদি’। প্রায় চার দশক ধরে দর্শকদের আনন্দ ও সচেতনতার মিশেলে মুগ্ধ করে আসা এই অনুষ্ঠানটি এবার পা দিল ৩৮ বছরে। আর এবারের ঈদ-পর্বে আবারও প্রমাণ করলেন নির্মাতা হানিফ সংকেত। সময় বদলায়, মাধ্যম বদলায়, কিন্তু ভালো কনটেন্টের আবেদন কখনো ফুরায় না।

এবারও বরাবরের মতোই শুরুতেই ছিল হৃদয়ছোঁয়া সেই চিরচেনা গান ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’। তবে এবারের উপস্থাপনায় ছিল ভিন্ন মাত্রা—বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে বসবাস করা একাকী মানুষদের জীবনের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে ঈদের আনন্দ ও বেদনার এক মিশ্র অনুভূতি। শুরুতেই এমন আবেগঘন পরিবেশনা দর্শকদের মন ছুঁয়ে যায়।

এরপর একে একে উঠে আসে সমাজের নানা স্তরের বাস্তবতা। উচ্চবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত—তিন শ্রেণির মানুষের ঈদবাজার নিয়ে নির্মিত মিউজিক্যাল ড্রামাটি ছিল সময়োপযোগী ও বাস্তবধর্মী। কারও বিলাসী কেনাকাটা, কারও সীমিত সামর্থ্য, আবার কারও একেবারেই না থাকা—এই বৈপরীত্যই যেন আমাদের সমাজের প্রতিচ্ছবি।

শহীদুজ্জামান সেলিম ও রোজী সিদ্দিকীর আরেকটি মিউজিক্যাল ড্রামায় এক চিরসত্য দার্শনিক তত্ত্বের প্রসঙ্গ এসেছে–‘বিশ্বাসে মিলায় কিন্তু বিশ্বাসই তো নাই’। দুজন ব্যবসায়ীর দোকানে কেনাকাটা এবং পরে সন্তানদের ঈদে বাড়ি আসার ক্ষেত্রে বিশ্বাসের প্রসঙ্গ এলেই এমন উক্তির অবতারণা ঘটে। আমাদের সমাজে পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যাওয়ার অতিবাস্তব এক সত্য এই উক্তিতে উঠে এসেছে।

দর্শকপর্বেও ছিল নতুনত্ব। প্রতীকী ‘তালা’ ব্যবহার করে সমাজের নানা সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, আর অতিথি হিসেবে উপস্থিত মোশাররফ করিম তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে সমাধানের দিকনির্দেশনা দেন। গুজব, দুর্নীতি, অন্যায়—সবকিছুর বিরুদ্ধে সচেতনতার বার্তা ছিল এই পর্বে।

এবারের ইত্যাদির একটি ব্যতিক্রমী আয়োজন ছিল ‘পরিষ্কার পুরস্কার’। ভালো মানুষদের সম্মান জানানোর মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচকতা ছড়িয়ে দেওয়ার এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। ভালো বাড়িওয়ালা, দায়িত্বশীল চালক বা মানবিক গৃহকর্ত্রী—এমন চরিত্রগুলো যেন আমাদের হারিয়ে যাওয়া মূল্যবোধের কথা মনে করিয়ে দেয়।

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ‘ভাইরাল সংস্কৃতি’ নিয়েও ছিল তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ। ‘ভাইরাল স্পেশালাইজড হাসপাতাল’ কিংবা ভিউ-সাবস্ক্রাইব বাড়ানোর অদ্ভুত প্রবণতা নিয়ে নির্মিত নাট্যাংশগুলো যেমন হাস্যরস তৈরি করেছে, তেমনি দিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

সব মিলিয়ে এবারের ‘ইত্যাদি’ শুধু বিনোদন নয় বরং সমাজের আয়না হয়ে উঠেছে। হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা তীক্ষ্ণ বার্তা, বাস্তবতার নির্ভুল উপস্থাপন আর মানবিক মূল্যবোধের আহ্বান—সবকিছু মিলিয়ে অনুষ্ঠানটি দর্শকের মন ভরাতে সক্ষম হয়েছে বলেই মনে হয়।

আর এই ধারাবাহিক সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে হানিফ সংকেতের স্বাধীনতা পদক প্রাপ্তি যেন একেবারেই যথার্থ—এক কথায়, সত্যিই ‘পরিষ্কার পুরস্কার’।

ইত্যাদিহানিফ সংকেত