বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনমঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬
বিবিধ

ফসল ঘরে তোলার আগে দুশ্চিন্তায় কৃষক

ফসল ঘরে তোলার আগে দুশ্চিন্তায় কৃষক

মাঠজুড়ে সবুজের সমারোহ, কোথাও কোথাও পাকার অপেক্ষায় হলুদ-সোনালি রঙের ছোপ–এই সময়টাই কৃষকের জন্য স্বপ্নের, আবার ভয়েরও। দিনের শেষে মাঠের ফসল ঘরে তুলতে পারলেই স্বস্তি। তবে এখন কৃষকের নজর আকাশের দিকে, কারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা তাদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হাওরাঞ্চলে এই ভয়টা একটু আলাদা। পানি নিয়ন্ত্রণে অভ্যস্ত কৃষকরা এখন ভয়ের কারণ দেখছেন ‘পাথর’ বা শিলাবৃষ্টিতে। মেঘ জমলেই বুক কেঁপে ওঠে–কেবল একবার শিলা নেমে এলে ধ্বংস অবধারিত।

হাওরের ওপর ঝুলছে আগাম বন্যার শঙ্কা
সিলেট অঞ্চলের হাওরগুলোতে এখন সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় হলো পাহাড়ি ঢল। সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টি এবং আগামী দিনগুলোর আবহাওয়ার পূর্বাভাসে কৃষকরা দিন গুনছেন আতঙ্কে। সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া–এই সাতটি হাওর জেলায় দেশের মোট বোরো উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ হয়। চলতি মৌসুমে প্রায় ৯ লাখ ৬৩ হাজার হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে, কিন্তু ফসল এখনও পুরোপুরি পাকেনি। মার্চের অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত আগাম বন্যার ঝুঁকি অনেক বাড়িয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, সুরমা-কুশিয়ারা ও ধনু-বাউলাই নদীর পানি বাড়ছে, যদিও এখনও বিপৎসীমার নিচে। আরও বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। প্রতিবছরের মতো এবারও ভারতের মেঘালয় ও আসাম থেকে নামা পাহাড়ি ঢল হাওর অঞ্চলের জন্য বড় হুমকি।

ফসল রক্ষা বাঁধে অনিয়ম ও দেরি
হাওরের কৃষকদের মূল প্রতিরক্ষা হলো ফসল রক্ষা বাঁধ। তবে এবারও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হয়নি। ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও অনেক এলাকায় দুরমুশ, স্লোপ কমপেকশন ও ঘাস লাগানোর কাজ এখনও বাকি। বৃষ্টি শুরু হওয়ার ফলে কার্যকারিতা নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, প্রতিবছরের মতো এবারও দেরি, অনিয়ম ও তদারকির অভাব রয়েছে। সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের কৃষক আব্দুল মোতালেব বলেন, বাঁধের কাজ শেষ হওয়ার আগেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। আগাম বন্যা এলে সব শেষ হয়ে যাবে।

বিজন সেন রায়, হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতা বলেন, বাঁধ নির্মাণে প্রতিবছরই দেরি হয়। যদি ফসল তলিয়ে যায়, আমরা কৃষকদের নিয়ে প্রতিবাদ গড়ে তুলব, আইনি ব্যবস্থা নেব।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ৫৩টি হাওরে প্রায় ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণে ১৪৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সেই বরাদ্দের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ২০১৭ ও ২০২২ সালের বিধ্বংসী বন্যার স্মৃতি এখনও তাজা, যা কৃষকের ভয় আরও বাড়িয়েছে।

শিলাবৃষ্টির আঘাতের কারণে ক্ষতি
হাওরের বাইরে বিভিন্ন জেলাতেও শিলাবৃষ্টি ভয়াবহ ক্ষতি করেছে। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে শিলায় ভুট্টা, মরিচ, বেগুনসহ ফসল মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। আম ও লিচুর মুকুল ঝরে গেছে।

ভুট্টাচাষি শাহজাহান মিয়া বলেন, বৃষ্টি শুরু হওয়ার আধাঘণ্টা আগেও আকাশ পরিষ্কার ছিল। হঠাৎ শিলা পড়তে শুরু করল। জমিতে গিয়ে দেখি সব গাছ পড়ে গেছে একদিনে প্রায় ৩,৮৬৪ হেক্টর বোরোধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে–প্রায় ২,৫০০ হেক্টর জমিতে। বড় শিলার আঘাতে গম, ভুট্টা, আলু, পেঁয়াজসহ নানা ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষকরা জানাচ্ছেন, প্রতি বিঘায় ৩৫-৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে, এখন সব নষ্ট।

সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে শিলাবৃষ্টির সঙ্গে জলাবদ্ধতাও যুক্ত হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা দুর্বল থাকায় জমি ডুবে যাচ্ছে, ধান পচে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর দুই লাখ ২৩ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। সম্ভাব্য উৎপাদন ১৪ লাখ টন, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫,০৫০ কোটি টাকা।

কৃষক আলাউদ্দিন বলেন, ধান নষ্ট হচ্ছে, আমরা দুশ্চিন্তায় আছি। আরেক কৃষক আবিদ মিয়া অভিযোগ করেন, কৃষি বিভাগের কেউ মাঠে আসেনি, পানি নামানোর ব্যবস্থা নেই।

কৃষি বিভাগ জানাচ্ছে, ক্ষয়ক্ষতির হিসাবের পাশাপাশি কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে প্রণোদনা দেওয়ারও প্রস্তুতি চলছে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুত্ব
কৃষি সচিব রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, ফসলের তিন মৌসুমে ক্ষতি হলে সরকারের পক্ষ থেকে প্রণোদনা, পুনর্বাসনসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। শিলাবৃষ্টির কারণে ফসলের ক্ষতি কত হয়েছে, তা নিরূপণ করা হচ্ছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম জানান, প্রতিবছর ১৫ মার্চ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত সাত মাসকে উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ সময় বা ‘ডেঞ্জার পিরিয়ড’ হিসেবে ধরা হয়। এ সময়ে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, কালবৈশাখী, অতিবৃষ্টি, বেড়িবাঁধ ভাঙন এবং লবণাক্ততার বিপদ থাকে। ১৫ মার্চ থেকে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত কালবৈশাখীর ঝড়ের শঙ্কা সবচেয়ে বেশি থাকে। হঠাৎ সৃষ্ট বজ্রঝড়, দমকা হাওয়া ও বজ্রপাতও উপকূলীয় অঞ্চলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে।

কৃষকশিলা বৃষ্টিহাওর