বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬
বিবিধ

নাড়ির টানে ঘরে ফেরা, ঈদযাত্রার অনন্য আবেগ

নাড়ির টানে ঘরে ফেরা, ঈদযাত্রার অনন্য আবেগ

ঈদুল ফিতর মানেই শুধু উৎসব নয়—এটি এক গভীর আবেগের নাম। বছরের অধিকাংশ সময় জীবিকার প্রয়োজনে শহরে কাটানো মানুষদের মনে এই সময় জেগে ওঠে এক অদম্য টান—ফিরে যাওয়ার টান, শেকড়ে ফেরার টান। প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষাই তখন হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে বড় চাওয়া।

ঈদের অন্তত এক সপ্তাহ আগে থেকেই শুরু হয় ঘরে ফেরার প্রস্তুতি। ব্যস্ত শহরের অলিগলি, শপিংমল, বাজার—সব জায়গাতেই তখন উৎসবের আমেজ। পরিবারের জন্য নতুন কাপড়, মিষ্টি, খেলনা কিংবা ছোট ছোট উপহার কেনার ধুম পড়ে যায়। একই সঙ্গে শুরু হয় টিকিট সংগ্রহের লড়াই—যা অনেকের জন্য একপ্রকার যুদ্ধের মতোই।

ভোররাত থেকেই দেশের বড় বড় বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটে জমে ওঠে মানুষের ঢল। কারো কাঁধে ভারী ব্যাগ, কারো হাতে উপহারের প্যাকেট, আবার কারো সঙ্গে ছোট শিশু—সবাই যেন একটাই গন্তব্যে ছুটছে, গ্রামের বাড়ির পথে। ক্লান্তি, ভিড়, অনিশ্চয়তা—সবকিছু মিলিয়েও এই যাত্রার ভেতরে থাকে এক অদ্ভুত আনন্দ, যা অন্য কোনো ভ্রমণে পাওয়া যায় না।

ঈদযাত্রায় ট্রেন অনেকের প্রথম পছন্দ। নিরাপদ ও তুলনামূলক আরামদায়ক হওয়ায় ট্রেনের টিকিট পেতে হিমশিম খেতে হয় যাত্রীদের। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই হাজারো মানুষ অনলাইনে অপেক্ষা করেন, একটি টিকিটের আশায়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই টিকিট শেষ হয়ে গেলে অনেকেই হতাশ হন, আবার কেউ দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে চেষ্টা চালিয়ে যান। তবে টিকিট হাতে পাওয়ার পর সেই আনন্দ যেন সব কষ্টকে মুছে দেয়—মনে হয়, বাড়ি ফেরার নিশ্চয়তা অবশেষে মিলেছে।

ট্রেনের ভেতরের পরিবেশও আলাদা এক অভিজ্ঞতা। অপরিচিত মানুষগুলো অল্প সময়েই হয়ে ওঠেন আপন। কেউ গল্পে মেতে ওঠেন, কেউ গান শোনেন, কেউবা নিজের খাবার ভাগ করে নেন পাশের যাত্রীর সঙ্গে। হাসি, আড্ডা আর গল্পের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ পথ কখন যে শেষ হয়ে যায়, তা টেরই পাওয়া যায় না।

অন্যদিকে, যাদের ট্রেনের টিকিট জোটে না বা যেসব এলাকায় ট্রেন চলাচল নেই, তাদের ভরসা বাসযাত্রা। রাজধানীর বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড তখন পরিণত হয় মানুষের মিলনমেলায়। সড়কে দীর্ঘ যানজট, ধীরগতির যাত্রা—এসব কষ্ট থাকলেও বাড়ি ফেরার আনন্দে সেগুলো যেন তুচ্ছ মনে হয়। কারণ প্রতিটি মুহূর্তই তখন প্রিয়জনের কাছে পৌঁছানোর অপেক্ষায় ভরা।

নদীপথের ঈদযাত্রা আবার একেবারেই ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। লঞ্চের ডেকে বসে নদীর শীতল বাতাসে ভেসে যাওয়া, ঢেউয়ের শব্দ শুনতে শুনতে রাত পাড়ি দেওয়া—এ যেন এক অনন্য অভিজ্ঞতা। পরিবার কিংবা সহযাত্রীদের সঙ্গে গল্প, আড্ডা আর স্মৃতিচারণে ভরে ওঠে পুরো যাত্রাপথ। অনেকের কাছেই এই লঞ্চভ্রমণ ঈদের সবচেয়ে উপভোগ্য অংশ হয়ে থাকে।

তবে সবার যাত্রা এতটা স্বস্তিদায়ক নয়। অনেকেই সময়মতো পৌঁছানোর জন্য পিকআপ, ট্রাক বা অন্যান্য পণ্যবাহী যানেও যাত্রা করেন, যা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও বাস্তবতার কারণে বেছে নিতে হয়। আবার কেউ কেউ নিজের ব্যক্তিগত গাড়িতে পরিবারের সবাইকে নিয়ে পথে নামেন, যাতে যাত্রা কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ হয়।

ঈদযাত্রা সবসময় মসৃণ হয় না। দীর্ঘ যানজট, অতিরিক্ত ভিড়, নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দেরিতে গাড়ি ছাড়ার মতো নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় যাত্রীদের। কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষাও করতে হয়। তবুও এই কষ্টগুলো যেন খুব বড় মনে হয় না, কারণ সামনে থাকে ভালোবাসার মানুষদের সঙ্গে মিলনের আনন্দ।

এই ঘরে ফেরার পথেই অনেকের মনে ভেসে ওঠে শৈশবের স্মৃতি। ছোটবেলার ঈদ, নতুন জামা পরে বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা, গ্রামের মাঠে দৌড়ঝাঁপ—এসব স্মৃতি মনে পড়তেই মন ভরে ওঠে আনন্দে। দীর্ঘদিন পর বাড়ি ফেরার উচ্ছ্বাস অনেকের জন্য হয়ে ওঠে বিশেষ অনুভূতি, যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

বাড়ি ফেরার আরেকটি আবেগঘন দিক হলো প্রিয়জনদের জন্য উপহার নিয়ে যাওয়া। ছোট ছোট উপহার, নতুন পোশাক কিংবা মিষ্টির প্যাকেট—এসবের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে ভালোবাসা ও যত্ন। বিশেষ করে শিশুদের মুখে হাসি ফোটানোর সেই মুহূর্তটি হয়ে ওঠে সবচেয়ে আনন্দময়।

সবশেষে বলা যায়, ঈদযাত্রা শুধুমাত্র এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যাওয়ার নাম নয়। এটি এক গভীর মানবিক অনুভূতি—যেখানে ভালোবাসা, স্মৃতি, অপেক্ষা আর ফিরে পাওয়ার আনন্দ একসঙ্গে মিশে যায়। প্রতি বছর লাখো মানুষ সব বাধা অতিক্রম করে ঘরে ফেরেন, কারণ প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিলেই উৎসব হয়ে ওঠে পূর্ণ।

এভাবেই ঈদযাত্রা হয়ে ওঠে এক অনন্য গল্প—যেখানে সব কষ্টকে ছাপিয়ে শেষ পর্যন্ত জয়ী হয় নাড়ির টান।

ঈদঈদযাত্রা