আনুষ্ঠানিকতার আয়নায় নারীর অধিকার ও অর্জন

নারীর অধিকার, সমতা ও ক্ষমতায়নের প্রশ্নকে বৈশ্বিক আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়ার লক্ষ্যেই ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। সেই সময় থেকেই দিনটি শুধু প্রতীকী উদযাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং নারীর অবদান, সংগ্রাম এবং সমতার দাবিকে নতুন করে স্মরণ করার উপলক্ষ হয়ে উঠেছে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই এই দিনটি নারীর অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নকে সামনে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশেও নব্বই দশক থেকে দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয়ে আসছে এবং ধীরে ধীরে এটি সামাজিক সচেতনতার অংশে পরিণত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসে জাতিসংঘ ঘোষিত বৈশ্বিক প্রতিপাদ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশও প্রতি বছর একটি জাতীয় প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে। গত এক দশকের প্রতিপাদ্যগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সময়ের প্রয়োজন এবং বৈশ্বিক আলোচনার ধারার সঙ্গে মিল রেখে নারীর অগ্রগতি, অধিকার, সমতা এবং ক্ষমতায়নের বিষয়গুলো বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরা হয়েছে। এসব প্রতিপাদ্য একদিকে নীতিগত প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন, অন্যদিকে সমাজে নারীর অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবার আহ্বানও বটে।
প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা
গত এক দশকে ঘোষিত প্রতিপাদ্যগুলোর দিকে তাকালে একটি ধারাবাহিক প্রতিশ্রুতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেমন ২০১৬ সালের প্রতিপাদ্য ছিল ‘অধিকার মর্যাদায় নারী-পুরুষ সমানে সমান’, আর ২০২৫ সালের প্রতিপাদ্য ‘সকল নারী ও মেয়েদের জন্য: অধিকার, সমতা, ক্ষমতায়ন’। এই ধারাবাহিকতা রাষ্ট্রের নীতিগত অঙ্গীকারকে নির্দেশ করে—নারীর উন্নয়ন ও সমতার প্রশ্নকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি সেখানে স্পষ্ট। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করলে দেখা যায়, ঘোষিত প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্যে এখনো বড় ধরনের ফাঁক রয়ে গেছে।
গত এক দশকে উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের নারীরা এগিয়ে গেলেও তাদের দৈনন্দিন জীবন এখনো সহিংসতা, বৈষম্য এবং নিরাপত্তাহীনতার নানা চ্যালেঞ্জে ঘেরা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত ২০২৪ সালের সহিংসতাবিষয়ক জরিপ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৭৬ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে স্বামী বা ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর সহিংসতার শিকার হয়েছেন। একই জরিপে দেখা যায়, অন্তত ৪১ শতাংশ নারী জরিপের আগের এক বছরের মধ্যেই এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন। সামগ্রিকভাবে প্রায় ৭৫.৯ শতাংশ নারী জীবনে অন্তত একবার কোনো না কোনো ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
গত পাঁচ বছরের তথ্যও একইভাবে উদ্বেগজনক। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ১১ হাজার ৭৫৮ নারী ও কন্যাশিশু নানা ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৬ হাজার ৩০৫টি ধর্ষণ এবং এক হাজার ৮৯টি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব ঘটনার ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৫৫ শতাংশের বেশি অপ্রাপ্তবয়স্ক।
অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অংশীদারিত্ব
বাংলাদেশের শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ এখনো পুরুষদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, কর্মক্ষম নারীদের প্রায় ৪৪ শতাংশ শ্রমবাজারে যুক্ত আছেন, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৮০ শতাংশ। কোভিড মহামারির সময় এবং পরবর্তী সময়ে শ্রমবাজার থেকে সরে যেতে বাধ্য হওয়া প্রায় ১৭ লাখ মানুষের মধ্যে বড় একটি অংশ নারী ছিলেন।
অন্যদিকে নারীর অদৃশ্য শ্রমও বৈষম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ পরিচালিত টাইম-ইউজ জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে নারীরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬.৮ ঘণ্টা অবৈতনিক গৃহস্থালি ও যত্নশীল কাজে ব্যয় করেন। তুলনায় পুরুষদের ক্ষেত্রে এই সময় মাত্র ১.২ ঘণ্টা। অর্থাৎ পরিবার ও সমাজের ভিত্তি টিকিয়ে রাখতে নারীর যে শ্রম ব্যয় হয়, তার বড় অংশই অর্থনৈতিক স্বীকৃতির বাইরে থেকে যায়।
রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরাসরি নির্বাচিত নারী প্রতিনিধির সংখ্যা ছিল মাত্র সাতজন, যা ৩০০ সাধারণ আসনের মাত্র ২.৩৫ শতাংশ। নির্বাচনে নারী প্রার্থীর অংশগ্রহণও ছিল মাত্র ৩.৯৩ শতাংশ, যা গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ভোটার হিসেবেও নারীর অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম ছিল, এবং নির্বাচনী সময়ে অনেক নারী অনলাইনে হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন। এই পরিস্থিতি সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নারীর অন্তর্ভুক্তি ও নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত দেয়।
এদিকে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি প্রকাশিত ‘জেন্ডার সোশ্যাল নর্মস ইনডেক্স’ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৬৯ শতাংশ মানুষ মনে করেন রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে পুরুষ নারীর তুলনায় বেশি যোগ্য। এই ধারণা কেবল নারীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণকে সীমিত করে না; বরং সমাজে পুরুষকেন্দ্রিক মানসিকতার গভীর উপস্থিতিকেও নির্দেশ করে।
রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলের ভূমিকা
গত এক দশকের নারী দিবসের প্রতিপাদ্য এবং নারীদের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য সামনে আসে। একদিকে উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে নারীর ভূমিকার প্রশংসা করা হয়, অন্যদিকে ঘর, কর্মক্ষেত্র, জনপরিসর এবং অনলাইন জগতে সহিংসতা ও বৈষম্যের ঝুঁকি তাদের প্রতিনিয়ত বহন করতে হয়। ফলে প্রশ্ন ওঠে—ঘোষিত প্রতিপাদ্যগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে?
অনেক ক্ষেত্রেই নারী অধিকারবিষয়ক মূল্যায়ন ও পরিসংখ্যান প্রকল্পকেন্দ্রিক হয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্পের ফলাফলকে প্রায়ই জাতীয় অগ্রগতির প্রতিনিধিত্ব হিসেবে তুলে ধরা হয়। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়—এই প্রতিবেদনগুলো কি সত্যিই রাষ্ট্রের নিজস্ব রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রতিফলন, নাকি উন্নয়ন সহযোগীদের প্রত্যাশা পূরণের একটি অংশ?
তবে বিষয়টি একপাক্ষিক নয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে আইন প্রণয়ন, নীতি নির্ধারণ, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে নারীর উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার সক্ষমতা রয়েছে। নারী উন্নয়ন নীতি, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ আইন এবং যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বিভিন্ন নীতিমালা এই সক্ষমতার উদাহরণ। কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন কেবল নীতি প্রণয়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না তার জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন।
রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের সীমাবদ্ধতা দেখা যায়। নির্বাচনী ইশতেহারে নারী অধিকারের বিষয়গুলো অনেক সময় পার্শ্বিক ইস্যু হিসেবে স্থান পায়। মূল রাজনৈতিক এজেন্ডায় তা প্রাধান্য পায় না। এর ফলে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নারীর কণ্ঠস্বর যথেষ্ট দৃশ্যমান হয় না এবং নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও তারা পুরুষকেন্দ্রিক কাঠামোর বাইরে কার্যকরভাবে বিস্তৃত হতে পারেন না। এর একটি উদাহরণ হলো—বাংলাদেশ Convention on the Elimination of All Forms of Discrimination Against Women (সিডও) সনদে স্বাক্ষর করলেও এখনো কিছু ধারায় সংরক্ষণ বজায় রেখেছে। এই আন্তর্জাতিক চুক্তির উদ্দেশ্যই হলো নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা এবং বৈষম্য দূর করতে রাষ্ট্রগুলোকে আইনগত ও নীতিগত বাধ্যবাধকতার আওতায় আনা।
করপোরেট খাতের দায়
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ নারী। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করেই বিপুল পরিমাণ পণ্য ও সেবা বাজারজাত করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই প্রতিষ্ঠানগুলো নারীদের কেবল ভোক্তা হিসেবে দেখে, নাকি তাদের জীবনের মানোন্নয়নে বাস্তব ভূমিকা রাখার দায়ও অনুভব করে?
করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে কিছু উদ্যোগ অবশ্যই দেখা যায়—নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন, দক্ষতা প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য সচেতনতা ইত্যাদি। তবে এসব উদ্যোগ অনেক সময় সীমিত বা প্রচারনির্ভর হয়ে থাকে। বাস্তবে নিরাপদ ও সমান কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা প্রদান, নেতৃত্বের পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং পণ্য ও পরিষেবার পরিকল্পনায় নারীর বাস্তব চাহিদা অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়গুলো এখনো অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত থাকে।
নারী আন্দোলনের প্রভাব ও কৌশল
বাংলাদেশের ইতিহাসে নারী আন্দোলনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে পরবর্তী দশকগুলোতে নারী অধিকার, শ্রম অধিকার, শিক্ষা এবং আইনি সংস্কারের প্রশ্নে নারী সংগঠন ও আন্দোলনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে বর্তমান বাস্তবতায় একটি নতুন প্রশ্ন সামনে আসে—এই পরিবর্তিত সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নারী আন্দোলনের কি সুস্পষ্ট এবং সমন্বিত কৌশল রয়েছে? বিশেষ করে নীতি পর্যায়ে কার্যকর অ্যাডভোকেসি এবং রাজনৈতিক প্রভাব সৃষ্টির ক্ষেত্রে। আজকের সময়ে নারী আন্দোলনের নতুন ধরনের চিন্তাভাবনা প্রয়োজন। কীভাবে সংগঠিত উদ্যোগের মাধ্যমে নারীবিরোধী প্রতিক্রিয়ার বিপরীতে শক্তিশালী বিকল্প বয়ান তৈরি করা যায় এবং রাষ্ট্র, করপোরেট খাত ও সমাজের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে বাস্তব নীতি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যায়—সেই প্রশ্নগুলো এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আন্দোলন শুধু প্রতিবাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে যথেষ্ট নয় বরং তা সুসংগঠিত নীতি-অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরিত হওয়া দরকার। যেখানে নারীর ক্ষমতায়ন কেবল নারীদের ওপর নির্ভর করবে না, বরং পুরুষ নেতৃত্ব, সামাজিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক শক্তিকেও অংশীদার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করবে।
সমতা, ন্যায় ও কর্মসূচি
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ছিলো ‘সকল নারী ও মেয়েদের জন্য অধিকার, ন্যায় ও কর্মসূচি’। এই প্রতিপাদ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—সমতা কেবল একটি স্লোগান নয় বরং তা বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে নারী দিবস শুধু উদযাপনের দিন নয় বরং এটি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান। সামাজিক প্রতিশ্রুতি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং নেতৃত্বের সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়নকে প্রতিদিনের বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা হওয়া উচিত। একই সঙ্গে এটি সরকার, রাজনৈতিক দল, করপোরেট খাত, পরিবার এবং সমাজ—সবার জন্যই একটি স্পষ্ট আহ্বান। কারণ নারী অধিকার নিশ্চিত করা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায় নয় বরং এটি একটি সমন্বিত, ধারাবাহিক এবং কার্যকর সামাজিক অঙ্গীকার।



