বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬
নারী

নারী দিবসের বাইরে নেই নারীর গল্প

নারী দিবসের বাইরে নেই নারীর গল্প

বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর ৮ মার্চ পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস। দিনটি এলেই গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নানা আয়োজনের মাধ্যমে নারীর সাফল্য, সংগ্রাম ও অনুপ্রেরণার গল্প সামনে আসে। আলোচনায় উঠে আসে অধিকার, সমতা ও ক্ষমতায়নের কথা। কিন্তু এই দৃশ্যমানতার মাঝেই প্রশ্ন উঠে—এই গল্পগুলো বছরের বাকি সময় কোথায় থাকে? কেন নারীর জীবনসংগ্রাম, অর্জন ও বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা যেন মূলত এই একটি দিনেই আলোচিত হয়?

নারী দিবস এলে চারদিকে যেন এক ধরনের প্রতীকী উচ্ছ্বাস তৈরি হয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অনুষ্ঠান আয়োজন করে, গণমাধ্যম বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছা বার্তার বন্যা বইতে থাকে। কর্মক্ষেত্রে অনেক জায়গায় নারীদের ফুল দিয়ে সম্মান জানানো হয়, তাদের অবদানকে তুলে ধরা হয় বিশেষ আলোচনায়।

কিন্তু এই উদযাপন একদিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। বছরজুড়ে যে নারী পরিবার, সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে অবিরাম শ্রম দিয়ে চলেছেন, তার গল্পগুলো খুব কমই নিয়মিতভাবে আলোচনায় আসে। যেন একদিনের জন্য আলো জ্বলে ওঠে, তারপর আবার তা নিভে গিয়ে দৈনন্দিন বাস্তবতার অন্ধকারেই হারিয়ে যায় নারীর গল্প।

নারীর জীবনের বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে এমন কাজ, যা সমাজে খুব কমই দৃশ্যমান। সংসার পরিচালনা, সন্তান লালন-পালন, পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের যত্ন নেওয়া, রান্না, ঘর পরিষ্কার রাখা—এসব কাজ প্রায় প্রতিটি সমাজেই নারীর দায়িত্ব হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু এই শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্য বা সামাজিক স্বীকৃতি খুব কমই দেওয়া হয়।

অথচ একটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবন স্বাভাবিকভাবে চলার পেছনে এই অদৃশ্য শ্রমই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। সমাজবিজ্ঞানীরা প্রায়ই বলেন, অর্থনীতির দৃশ্যমান কাঠামোর নিচে দাঁড়িয়ে আছে এই অদৃশ্য গৃহশ্রম। তবু এই শ্রমের গল্প খুব কমই সংবাদে আসে, খুব কমই আলোচনায় উঠে আসে। ফলে নারীর অবদান অনেক সময় ইতিহাসের নীরব প্রান্তেই থেকে যায়।

নারীর গল্প কম দৃশ্যমান হওয়ার পেছনে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও বড় ভূমিকা রাখে। অনেক সমাজে এখনো নারীর কাজকে অর্জন হিসেবে দেখা হয় না; বরং তা ‘স্বাভাবিক দায়িত্ব’ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। ফলে নারীর অবদানকে আলাদা করে গল্প হিসেবে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা অনেকেই অনুভব করেন না।

এই মানসিকতা শুধু পরিবার বা সমাজেই নয়, কখনো কখনো গণমাধ্যমের কাঠামোতেও প্রতিফলিত হয়। সংবাদে বড় ঘটনা, রাজনীতি বা অর্থনীতির আলোচনায় জায়গা পেলেও নারীর দৈনন্দিন সংগ্রাম অনেক সময় গুরুত্ব পায় না। ফলে নারীর বাস্তব জীবন ও অভিজ্ঞতার একটি বড় অংশ দৃশ্যমানতার বাইরে থেকে যায়।

প্রতিদিন অসংখ্য নারী নানা ধরনের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পথ তৈরি করছেন। কেউ কৃষিক্ষেত্রে কাজ করছেন, কেউ গার্মেন্টস কারখানায় শ্রম দিচ্ছেন, কেউ শিক্ষকতা করছেন, কেউ ব্যবসা বা প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করছেন। আবার কেউ ঘরের ভেতর থেকেই পরিবারকে টিকিয়ে রাখার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।

কিন্তু এই বাস্তব গল্পগুলো নিয়মিতভাবে সামনে আসে না। গণমাধ্যমে নারীর গল্প অনেক সময় বিশেষ উপলক্ষের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রকাশ পায়—যেমন নারী দিবস, মা দিবস বা কোনো বিশেষ ঘটনা। ফলে নারীর সংগ্রাম ও সাফল্যের ধারাবাহিকতা সমাজের সামনে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয় না।

তেমনই এক না বলা গল্প হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার চা–বাগান, কৃষি ও শিল্প খাতে কর্মরত হাজারো নারীর। কর্মরত এই নারীরা শ্রমিক নীরবে কঠোর পরিশ্রম করে সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। সংসারের ব্যয় সামলানো থেকে শুরু করে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা—সবকিছুই সামলাতে প্রতিদিন সময় ও সমাজের নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করছেন তারা।

চা–বাগানের নারী শ্রমিকদের ভাষ্য, ভোরের আলো ফোটার আগেই ঝুড়ি হাতে বাগানের পথে হাঁটতে হয় তাদের। সারাদিনের কঠোর পরিশ্রম শেষে ঘরে ফিরে আবার সংসারের দায়িত্ব। জীবন-জীবিকার তাগিদে কেউ কেউ বাড়তি কাজও করেন। কিন্তু তাদের সমস্যা ও সংকট নিয়ে দিবসের আলোচনায় কথা উঠলেও বাস্তবে সমাধান আসে না অনেক ক্ষেত্রেই।

নোয়াপাড়া চা–বাগানের নারী শ্রমিক নীলমণি রেলি বলেন, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কাজ করেও খুব বেশি মজুরি পান না। তবু সংসারের প্রয়োজনেই কাজ চালিয়ে যেতে হয়। পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষ কম হওয়ায় বাগানের কাজই তাদের প্রধান ভরসা।

শুধু চা–বাগানেই নয়, উপজেলার আশপাশের গ্রামগুলোতেও কৃষিকাজে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। ধান রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, সবজি চাষ কিংবা ফসল কাটার মতো কাজে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। অনেক ক্ষেত্রে পুরুষের সমান পরিশ্রম করলেও মজুরির ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে।

বৈকুণ্ঠপুর চা–বাগানের নারী শ্রমিক মমতা চাষা জানান, মৌসুম এলেই মাঠের কাজ বেড়ে যায়। ধান লাগানো বা ফসল কাটার সময় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাঠেই থাকতে হয়। এরপর বাড়ি ফিরে আবার রান্না ও পরিবারের অন্যান্য কাজ সামলাতে হয়। তার মতে, শিল্পকারখানায় যারা কাজ করেন, তারা তুলনামূলকভাবে কিছুটা ভালো অবস্থায় আছেন।

মমতা আরও বলেন, জাতীয় বা আন্তর্জাতিক দিবসে শ্রমজীবী নারীদের কথা আলোচনা হলেও তাদের সরাসরি সম্পৃক্ত করা হয় না। সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করা হলে তারা আরও ভালোভাবে কাজ করতে পারতেন।

মাধবপুরে গড়ে ওঠা বিভিন্ন শিল্পকারখানাতেও কাজ করছেন অনেক নারী শ্রমিক। ফাতেমা বেগম নামে এক শ্রমিক জানান, তিনি দুই মেয়েকে নিয়ে একটি কারখানায় কাজ করেন। নারী দিবস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি তেমন কিছু জানেন না। তবে কারখানায় কাজ করার ফলে আগের তুলনায় তাদের সংসার কিছুটা স্বচ্ছল হয়েছে।

ফাতেমা বলেন, তাদের মতো হাজার হাজার নারী এখন মাধবপুরের শিল্পকারখানায় কাজ করছেন। এতে সংসার চালানো সহজ হয়েছে। কিন্তু বিশেষ দিবসে শ্রমজীবী নারীদের নিয়ে আলোচনা হলেও তাদের সেই আয়োজনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকে না।

নারীর গল্প যদি এভাবে কেবল একটি দিবসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা প্রকৃত অর্থে পরিবর্তন আনে না। প্রয়োজন বছরের প্রতিটি দিনেই নারীর অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া। শুধু বিশেষ উপলক্ষ নয়, প্রতিদিনের জীবনে নারীর সংগ্রাম, সাফল্য ও অভিজ্ঞতার গল্প নিয়মিতভাবে তুলে ধরা জরুরি।

গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন—সব ক্ষেত্রেই এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। কারণ নারীর গল্প মানে শুধু কোনো বিশেষ অর্জনের গল্প নয় বরং তা সমাজের অর্ধেক মানুষের বাস্তব জীবন, সংগ্রাম ও স্বপ্নের গল্প।

প্রকৃত পরিবর্তন তখনই সম্ভব, যখন বছরের প্রতিটি দিনেই নারীর জীবন, সংগ্রাম ও অবদানকে সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। কারণ নারীর গল্প কোনো একটি দিনের গল্প নয়—এটি প্রতিদিনের, প্রতিটি সময়ের, প্রতিটি সমাজের গল্প।

আন্তর্জাতিক নারী দিবসচা–বাগানচা–শ্রমিকনারী