বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬
নারী

দিবসের মানে খুঁজে পাক নারী

দিবসের মানে খুঁজে পাক নারী

বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস কিন্তু এই দিবস ঘিরে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে—বছরে একটি দিন আলাদা করে উদযাপনের সত্যিই কোনো অর্থ আছে কি? যখন বছরের প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্তেই নারীকে বঞ্চনা, বৈষম্য ও সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়, তখন মাত্র ২৪ ঘণ্টাকে কীভাবে ‘নারী দিবস’ বলা যায়? পুঁজিবাদী বাজারব্যবস্থার এই সময়ে নারী দিবস অনেক ক্ষেত্রেই যেন একটি বিক্রয়যোগ্য পণ্যে পরিণত হয়েছে। বেগুনি শাড়ির আয়োজন, কেনাকাটায় বিশেষ ছাড় কিংবা প্রসাধনী কোম্পানির ফর্সা হওয়ার ক্রিম বা চুল সোজা করার বিজ্ঞাপনের জাঁকজমকের আড়ালে অনেক সময় ঢাকা পড়ে যায় দিবসটির প্রকৃত চেতনা।

অথচ ইতিহাস বলছে, নারী দিবসের সূচনা কোনোভাবেই নারীর বাহ্যিক সৌন্দর্যকে সামনে আনা বা পিতৃতান্ত্রিক সমাজের আদর্শ ‘ভালো স্ত্রী’ বা ‘নিখুঁত মা’ তৈরির ধারণা থেকে হয়নি। বরং এর জন্ম হয়েছে শ্রমজীবী নারীদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। ১৯০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, ন্যায্য মজুরি, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি বন্ধ এবং ভোটাধিকারের দাবিতে নারী শ্রমিকদের যে আন্দোলন শুরু হয়, তার ধারাবাহিকতায় ১৯১০ সালে জার্মান কমিউনিস্ট নেত্রী ক্লারা জেটকিন আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের প্রস্তাব দেন। পরবর্তীতে ৮ মার্চ দিনটিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অনেক পরে ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে দিবসটিকে স্বীকৃতি দেয়। তাই এটি কেবল একটি ২৪ ঘণ্টার উদযাপন নয় বরং পৃথিবীর সব জাতিগোষ্ঠীর নারীর দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ ও প্রতিরোধের প্রতীক।

প্রতিবছর অসংখ্য নারী ও কন্যাশিশুর বঞ্চনা ও নিপীড়নের ভেতর দিয়েই রচিত হচ্ছে নতুন ইতিহাস। এই বৈষম্যের শুরু অনেক সময় মায়ের গর্ভ থেকেই। জাতিসংঘের পপুলেশন ফান্ডের ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে ১৪ কোটিরও বেশি কন্যাশিশু ভ্রূণ অবস্থাতেই হত্যা করা হয়েছে। কেবল কন্যাসন্তান হওয়ার কারণে তাদের জন্মের আগেই মুছে দেওয়া হয়েছে পৃথিবী থেকে। আর জন্ম নিলেও অনেক ক্ষেত্রে তাকে মুখোমুখি হতে হয় ধর্মীয় ও সামাজিক কাঠামোর তৈরি নানা বৈষম্যের—পুত্র না হওয়ার বঞ্চনা। অনেক ধর্মীয় ব্যাখ্যায় বলা হয়, কন্যা বংশধারা বহন করে না সামাজিক ধারণায় কন্যাসন্তান পরিবারকে নিরাপত্তা দিতে পারে না। রাষ্ট্রীয় কাঠামোতেও সম্পদের উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে কন্যারা অনেক সময় বঞ্চিত হয়। ফলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—প্রায় সব ক্ষেত্রেই নারীর অধিকার খর্ব করা হয় এবং তার মর্যাদা ও ইচ্ছাকে যথাযথ মূল্য দেওয়া হয় না।

যেসব দেশ বুঝতে পেরেছে যে অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে পিছিয়ে রেখে সভ্যতার অগ্রগতি সম্ভব নয় তারা নারীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। তারা শিক্ষায় সমান সুযোগ তৈরি করছে, সমাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গাগুলোতে নারীর উপস্থিতি বাড়াচ্ছে এবং শ্রমবিভাজনে নারী-পুরুষের প্রচলিত ধারণা ভাঙতে চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে নারী-পুরুষের শারীরিক ভিন্নতাকে শক্তির একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে দেখার পুরোনো ধারণাও তারা পরিত্যাগ করছে। এর ফলেই আজ সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী কিংবা ক্রীড়াঙ্গন—সবখানেই নারীর সফল উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। বিজ্ঞান, সাহিত্য, সমাজ বিশ্লেষণ, সাংবাদিকতা এবং সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও নারী তার নৈপুণ্য ও সক্ষমতা প্রমাণ করছে। তবে এই পথ কখনোই সহজ ছিল না বরং যুগে যুগে নারীদের নিজেদের ন্যায্য অধিকার অর্জনের জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে।

Advertisements

এ প্রসঙ্গে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী মেরি কুড়ির বঞ্চনার কথা উল্লেখ করা যায়। তিনি পৃথিবীর একমাত্র ব্যক্তি যিনি পদার্থবিজ্ঞান (১৯০৩) ও রসায়ন (১৯১১)—দুটি ভিন্ন শাখায় নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। অথচ ১৯০৩ সালে তার নাম প্রস্তাবিত হলেও শুরুতে নোবেল পুরস্কারের ঘোষণায় তার সহযোগীদের নাম সামনে এলেও কেবল নারী হওয়ার কারণে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। পরে ১৯১১ সালে দ্বিতীয়বার নোবেল পেলেও তিনি ফ্রান্সের বিজ্ঞান একাডেমির সদস্যপদ থেকে বঞ্চিত হন। এমনকি সে সময় ফরাসি সংবাদপত্রগুলোতে তার ব্যক্তিগত জীবন ও সম্পর্ক নিয়ে নানা ধরনের নেতিবাচক লেখালেখিও হয়েছিল।

মূলত সমাজে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা যত শক্তিশালী হয়েছে, নেতৃত্ব, নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গাগুলোতে নারীর অংশগ্রহণ তত কমে গেছে। পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে নারীদের প্রায়ই ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে দেখার প্রবণতা দেখা যায়। ফরাসি দার্শনিক সিমন দ্য ব্যুভোয়ার তার লেখায় ব্যাখ্যা করেছিলেন, কীভাবে সমাজের কাঠামো নারীকে অদৃশ্য ও নীরব করে রাখে। ফলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব স্তরেই এমন প্রথা, নৈতিক মানদণ্ড ও আইনি কাঠামো তৈরি হয়েছে, যা অনেক সময় নারীকে দমিয়ে রাখে এবং তাদের ওপর নিপীড়ন চালানোর সুযোগ তৈরি করে। তাই এবারের নারী দিবসের আলোচনায় নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার, ন্যায়বিচার এবং তার বাস্তব প্রয়োগ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

ইউএন ওম্যান-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে নারীরা বিদ্যমান আইনি অধিকারের মাত্র ৬৪ শতাংশ বাস্তবে ব্যবহার করতে পারছেন। অর্থাৎ আইনি কাঠামো থাকলেও তা বাস্তবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বাংলাদেশের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং ইউএনএফপিএ’র ২০২৪ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, ৭৬ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময় সঙ্গীর সহিংসতার শিকার হয়েছেন। অথচ তাদের মধ্যে ৬৪ শতাংশ নারী ঘটনাটি গোপন রেখেছেন। জরিপের আগের বছরে মাত্র ৭ শতাংশ নারী আইনের আশ্রয় নিয়েছেন। অন্যদিকে স্বামী বা সঙ্গী ছাড়া অন্য কারও দ্বারা নির্যাতনের ঘটনায় মাত্র ১৩ শতাংশ নারী আইনি ব্যবস্থার দ্বারস্থ হয়েছেন।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে দেশে ২ হাজার ৮০৮ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৭৮৬ জন ধর্ষণের শিকার, এবং তাদের মধ্যে ৫৪৩ জনই কন্যাশিশু। উল্লেখ্য, এই পরিসংখ্যান কেবল প্রকাশিত ঘটনার ভিত্তিতে তৈরি। অপ্রকাশিত ঘটনার হিসাব করলে প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ হতে পারে।

ধর্ষণের ঘটনা কেন দিন দিন বাড়ছে—এই প্রশ্ন বারবার সামনে আসে। আইন থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ধর্ষণ আইনে এখনো একটি আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ সংজ্ঞার অভাব রয়েছে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন। বয়সসংক্রান্ত কিছু বিধান পরোক্ষভাবে বাল্যবিবাহকে উৎসাহিত করে বলেও সমালোচনা রয়েছে। ভুক্তভোগীর চরিত্রগত সাক্ষ্য গ্রহণের বিরুদ্ধে আইন থাকলেও বাস্তবে তার অপব্যবহার ও বৈষম্যমূলক প্রয়োগ দেখা যায়। তাই শুধু আইন সংশোধন করলেই হবে না; যারা আইন প্রয়োগ করবেন তাদের দক্ষতা, মানবিকতা ও সদিচ্ছাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সবশেষে মনে রাখতে হবে—‘Justice delayed is justice denied’। অর্থাৎ বিচার বিলম্বিত হওয়া মানেই অনেক ক্ষেত্রে বিচার অস্বীকার করা। নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলো দ্রুত বিচার আইনের আওতায় আনা, তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়াকে আরও দক্ষ ও সংবেদনশীল করা এখন সময়ের দাবি। পুলিশ, চিকিৎসা, ফরেনসিক এবং বিচারিক ব্যবস্থায় বিশেষ প্রশিক্ষিত দল গঠন করা জরুরি। একই সঙ্গে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে স্পষ্টভাবে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। তবেই এ দেশে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার সত্যিকার অর্থে নিশ্চিত হবে।

Advertisements
আন্তর্জাতিক নারী দিবসনারী