রমজানে সেহেরির আনন্দ : বাহিরে কোথায় করবেন সেহেরি?

বর্তমানে এই রমজান মাসকে কেন্দ্র করে ঢাকার খাবারের মানচিত্র যেন বদলে যায়। শহরের নানা প্রান্তে জ্বলে ওঠে চুলা, ভিড় জমে রেস্তোরাঁয়। কেউ খোঁজেন পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্বাদ, কেউ আবার চান আধুনিক বুফে বা ভিন্নধর্মী কুইজিন হোক সেটা সেহেরি কি ইফতারে।
সেহরি এখন আর শুধু ঘরের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা হয়ে উঠেছে এক উৎসব। সেহেরির জন্য চিরচেনা নিস্তব্ধতা ভেঙে ভোজনরসিকদের জন্য শুরু হয় প্রিয়জনদের নিয়ে মাঝরাতের এক রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চার। আর এই আনন্দময় ভ্রমণে বাড়তি স্বস্তি যোগ করেছে উবারসহ বিভিন্ন রাইড শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মগুলো, যা গভীর রাতেও ঢাকার অলিতে-গলিতে বা শহরের উপকণ্ঠে যাওয়ার পথকে করেছে অনেক বেশি সহজ এবং নিরাপদ।
হোটেল আল-রাজ্জাক
সেহরির কথা উঠলেই ভোজনরসিকদের মনে সবার আগে আসে পুরান ঢাকার নাম। নাজিরাবাজারের সরু গলিতে পা রাখলেই নাকে আসবে হাজী নান্না বিরিয়ানির সেই বিখ্যাত মোরগ পোলাওয়ের সুবাস। একটু সামনে এগোলেই বিসমিল্লাহ কাবাবের খাসির চাপ আর গরু গুর্দার ম ম গন্ধে ক্ষুধা বেড়ে যাবে কয়েকগুণ। ভোজন শেষে এক গ্লাস বিউটি লাচ্ছি বা স্পেশাল ফালুদা না হলে যেন তৃপ্তিটাই অপূর্ণ থেকে যায়। বংশালের হোটেল আল-রাজ্জাক তো সেহরির এক অঘোষিত কিংবদন্তি। নরম খাসির বিরিয়ানি, কাচ্চি, লেগ রোস্ট, খাসির গ্লাসি, পোলাও, ডাল-ভাত—সবকিছুতেই আছে পুরান ঢাকার স্বাদ ও ঘ্রাণ। বড় ডেগে রান্না হওয়া খাবারের আলাদা এক উষ্ণতা আছে, যা রাতজাগা ঢাকাকে টেনে আনে। সাদামাটা পরিবেশ, দ্রুত সার্ভিস এবং সাশ্রয়ী দাম—সেহরির জন্য এটিকে করে তোলে নির্ভরযোগ্য ঠিকানা।
হোটেল স্টার (প্রা.) লি.
সেহরির সময়ে তাদের কাচ্চি, কাবাব, নেহারি ও মগজ ভুনা আলাদা জনপ্রিয়তা পায়। নরম রুটি আর গরম ধোঁয়া ওঠা কাবাব কিংবা মগজ ভুনা ভোরের আগে ক্ষুধা মেটাতে দারুণ সঙ্গী। জায়গাটি ঝাঁ-চকচকে নয়, কিন্তু স্বাদের ক্ষেত্রে আপস নেই। বন্ধুবান্ধব নিয়ে সেহরি করতে চাইলে এখানে আড্ডার আবহও পাওয়া যায়। দাম তুলনামূলক মধ্যম, পরিমাণ বেশ ভালো—যা রাতের শেষভাগে তৃপ্তি দেয়।
ক্রাউন প্লাজা ঢাকা গুলশান
ক্রাউন প্লাজা ঢাকা গুলশান সেহরিকে দেয় আন্তর্জাতিক বুফের রূপ। আরবি, এশিয়ান ও কন্টিনেন্টাল নানা পদ সাজানো থাকে পরিপাটি কাউন্টারে। নরম আলো, প্রশস্ত ডাইনিং স্পেস আর পেশাদার সার্ভিস—সব মিলিয়ে অভিজ্ঞতা হয় প্রিমিয়াম। যারা পরিবার নিয়ে বা করপোরেট আড্ডার আমেজে সেহরি করতে চান, তাদের জন্য এটি উপযুক্ত। দাম তুলনামূলক বেশি হলেও মান ও বৈচিত্র্যে তা পুষিয়ে যায়। বিশেষ করে লাইভ স্টেশনগুলো আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
মোহাম্মদপুর, বেইলি রোড ও উত্তরার বৈচিত্র্য
ঐতিহ্যবাহী বিহারি খাবারের স্বাদ পেতে অনেকেই ছোটেন মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে। এখানকার বোবার বিরিয়ানি বা মুস্তাকিম চাপের তুলনা হয় না। আবার আভিজাত্য আর আধুনিকতার মিশেল পেতে বেইলি রোডের ফখরুদ্দিনের কাচ্চি বা ভেতো বাঙালির মেনু বরাবরই পছন্দের তালিকায় থাকে। যারা একটু শান্ত পরিবেশ চান, তারা বেছে নেন উত্তরার দিয়াবাড়ি। খোলা আকাশের নিচে নদীর হাওয়ায় সেখানে পাওয়া যায় গ্রাম্য স্বাদের হাঁস ভুনা ও ভর্তা-ভাত।
স্কাইপুল রেস্টুরেন্ট
সিক্স সিজনস হোটেলের স্কাইপুল রেস্টুরেন্ট ছাদঘেরা অভিজ্ঞতায় সেহরিকে করে তোলে বিশেষ। শহরের আলোঝলমলে দৃশ্যের মাঝে বাফে বা সেট মেনু উপভোগ করা যায়। দেশি-বিদেশি নানা পদ, লাইভ কাউন্টার ও ডেজার্ট স্টেশন আকর্ষণীয়। রোমান্টিক বা বিশেষ আয়োজনের জন্য জায়গাটি মানানসই। দাম প্রিমিয়াম হলেও পরিবেশ ও উপস্থাপনায় আছে আলাদা মাত্রা। ভোরের আগে শহরকে অন্য চোখে দেখার সুযোগ দেয় এই স্থান।
মাওয়া ঘাটে ইলিশ-ভাতের রোমাঞ্চ
শহর ছাড়িয়ে যাদের মন টানে প্রকৃতির কাছে, তাদের গন্তব্য এখন মাওয়া ঘাট। রাত ১টা বাজতেই সেখানকার রেস্তোরাঁগুলোতে শুরু হয় উৎসবমুখর আনাগোনা। প্রধান আকর্ষণ—পদ্মার টাটকা ইলিশ কড়কড়ে ভাজা আর ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত। সাথে ইলিশ ভাজার ফেনা ওঠা গরম তেল আর শুকনা মরিচ যার এক লোকমা মুখে দিলেই বোঝা যায় কেন মানুষ গভীর রাতে এখানে ছুটে আসে। মাওয়ার প্রশস্ত এক্সপ্রেসওয়ে আর পদ্মা সেতুর মায়াবী আলোকসজ্জা এই ভ্রমণকে করে তোলে প্রাণবন্ত।



