বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬
নারী

নোনাজলের দহনে উপকূলের নারীরা

নোনাজলের দহনে উপকূলের নারীরা

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল—সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট কিংবা ভোলা প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ভরা। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে নোনাজলের কঠিন বাস্তবতা। জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার বিস্তারে এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকা হয়ে উঠেছে অনিশ্চিত। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছেন নারীরা। প্রজনন স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে শুরু করে জরায়ুমুখ ক্যান্সারের মতো জটিল রোগ সবকিছুর ভার যেন তাদের কাঁধেই।

নোনাজলে জীবন, নোনাজলে মরণ
উপকূলের বহু নারীর প্রধান জীবিকা চিংড়িঘের বা নদীতে মাছ ধরা। পরিবার চালাতে কিশোরী বয়স থেকেই অনেককে কোমরসমান নোনাপানিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয়। দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানির সংস্পর্শে থাকার ফলে তাদের প্রজননতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণ, তলপেটের ব্যথা ও অস্বাভাবিক স্রাব এখানে নিত্যদিনের ঘটনা। অনেক ক্ষেত্রেই এসব সমস্যাকে ‘স্বাভাবিক’ ভেবে অবহেলা করা হয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের সতর্কবার্তা
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে থাকলে নারীর যোনিপথ ও জরায়ুর স্বাভাবিক জীবাণু ভারসাম্য নষ্ট হয়। এতে ক্রনিক ইনফেকশন বা দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ দেখা দেয়। অতিরিক্ত লবণাক্ততা জরায়ুমুখে ক্ষত তৈরি করতে পারে, যা পেলভিক ইনফ্ল্যামেটরি ডিজিজের ঝুঁকি বাড়ায়।

এই দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ ও সংক্রমণই জরায়ুমুখ ক্যান্সারের অন্যতম ঝুঁকিকারক হিসেবে কাজ করতে পারে। কিন্তু নিয়মিত স্ক্রিনিং বা ভায়া টেস্টের সুযোগ সীমিত হওয়ায় প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা সম্ভব হয় না।

মাসিককালীন স্বাস্থ্যঝুঁকি
উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির তীব্র সংকট রয়েছে। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার জন্য অনেক নারী বাধ্য হয়ে নোনাপানি ব্যবহার করেন। মাসিকের সময় পুরোনো কাপড় ব্যবহার এবং তা অপরিষ্কার পানিতে ধোয়ার ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

দারিদ্র্য ও সচেতনতার অভাবে স্যানিটারি ন্যাপকিন অনেকের নাগালের বাইরে। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে ব্যবহৃত কাপড় দ্রুত জীবাণু ছড়ায়, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সার-পূর্ব অবস্থার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

জরায়ু কেটে ফেলার প্রবণতা
কিছু লবণাক্ততাপ্রবণ এলাকায় জরায়ুসংক্রান্ত জটিলতা এতটাই বেড়েছে যে, অল্প বয়সেই অনেক নারী জরায়ু অপসারণে বাধ্য হচ্ছেন। চিকিৎসকরা বলছেন, সংক্রমণের মূল কারণ দূর না করে শুধু জরায়ু অপসারণ দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। বরং এতে হরমোনজনিত ভারসাম্যহীনতা, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

এ ছাড়া সামাজিক প্রভাবও গভীর। জরায়ু অপসারণের পর অনেক নারী পারিবারিক অস্থিরতা ও পরিত্যাগের শিকার হচ্ছেন।

সমাধানের পথ
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন—
সুপেয় পানির নিশ্চয়তা: বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও নিরাপদ পানির স্থায়ী ব্যবস্থা।
নিরাপদ মাসিক ব্যবস্থাপনা: স্যানিটারি ন্যাপকিন সহজলভ্য করা ও সচেতনতা বাড়ানো।
বিকল্প কর্মসংস্থান: নারীদের নোনাপানির কাজ থেকে সরিয়ে আয়ের অন্য সুযোগ তৈরি।
নিয়মিত স্ক্রিনিং: কমিউনিটি পর্যায়ে জরায়ুমুখ ক্যান্সার পরীক্ষার ব্যবস্থা জোরদার করা।

উপকূলের নারীরা প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছেন। কিন্তু নোনাজলের নীরব দহন তাদের ভেতর থেকে ক্ষয়ে দিচ্ছে। তাদের স্বাস্থ্য ও মর্যাদা রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

উপকূলনারী