মৃত নারীর জরায়ুতে মাতৃত্বের স্বপ্নপূরণ, জন্ম নিল এক আশ্চর্য শিশু

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে আরেকটি মাইলফলক যুক্ত হলো — এক মৃত নারীর জরায়ু প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে জরায়ুহীন এক নারীর কোলজুড়ে এলো সন্তান। যে নারীর জন্মগতভাবেই জরায়ু নেই, তার মাতৃত্বের স্বপ্ন পূরণ হলো আধুনিক চিকিৎসার হাত ধরে।
শিশুটির নাম রাখা হয়েছে হিউগো পাওয়েল। বয়স যখন ১৬ বছর, জানতে পারেন তিনি কোনও দিনও মা হতে পারবেন না। কারণ, সন্তানধারণের জন্য জরায়ুই যে নেই। এর পরেও মনের জোর হারাননি গ্রেস বেল। বর্তমানে একটি সুস্থ এবং স্বাভাবিক শিশুর জন্ম দিয়েছেন তিনি।
ব্রিটেনের বাসিন্দা গ্রেস বেল, একসময় জানতে পারেন শারীরিক গঠনে বাইরে থেকে কোনও অস্বাভাবিকতা না থাকলেও, শরীরের ভিতরে এমন এক জন্মগত ত্রুটি রয়ে গিয়েছে, যা বাকিদের থেকে আলাদা করে দিয়েছে তাঁকে। গ্রেস বেল বলেন, ‘মেয়ার রকিটানস্কি কুস্টার হাউসার সিন্ড্রোম’ নামক এক বিরল শারীরিক সমস্যা নিয়ে জন্মেছিলেন তিনি , যার ফলে তার শরীরে জরায়ু গঠিত হয়নি। কৈশোরে চিকিৎসকরা তাকে জানিয়েছিলেন যে তিনি কোনোদিন মা হতে পারবেন না। তবে, প্রথমবারের মতো একজন মৃত দাতার জরায়ু ব্যবহার করে সফলভাবে মা হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন তিনি। চিকিৎসকেরা বলছেন, এটি শুধু একটি সফল অস্ত্রোপচার নয়; এটি হাজারো জরায়ুহীন নারীর জন্য নতুন আশার আলো। এতদিন যারা মা হওয়ার স্বপ্ন দেখেও তা পূরণ করতে পারেননি, তাদের সামনে খুলে গেল এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার।
বিশ্বজুড়ে দীর্ঘদিন ধরেই জরায়ু প্রতিস্থাপন নিয়ে গবেষণা চলছিল। কিন্তু মৃত দাতার জরায়ু সফলভাবে প্রতিস্থাপন করে সুস্থ শিশুর জন্ম—এখনও বিরল ঘটনা। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক দল জানিয়েছেন, পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত জটিল ও সূক্ষ্ম। প্রথমে দাতার শরীর থেকে জরায়ু সংরক্ষণ, পরে গ্রহীতার শরীরে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে প্রতিস্থাপন এবং দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের পর ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (আইভিএফ) পদ্ধতিতে গর্ভধারণ— প্রতিটি ধাপেই ছিল চ্যালেঞ্জ।
২০২৪ সালের জুন মাসে অক্সফোর্ডের দ্য চার্চিল হাসপাতালে ১০ ঘণ্টা ধরে চলে অস্ত্রোপচার। গ্রেসের শরীরে প্রতিস্থাপিত হয় মৃত নারীর দান করে যাওয়া জরায়ু। কয়েক মাস পর ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (আইভিএফ, সাধারণভাবে টেস্টটিউব বেবি বলা হয়ে থাকে) করা হয়। গ্রেসের শরীরে বেড়ে উঠতে থাকে সেই সন্তান। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তার জন্ম হয় পশ্চিম লন্ডনের কুইন চারলটস অ্যান্ড চেলসি হাসপাতালে। জন্মের সময় তার ওজন ছিল প্রায় সাত পাউন্ড। এই সফল অস্ত্রোপচার ও প্রজনন প্রক্রিয়ার নেতৃত্বে ছিলেন অধ্যাপক রিচার্ড স্মিথ, যিনি ‘ওম্ব ট্রান্সপ্লান্ট ইউকে’ চ্যারিটির ক্লিনিক্যাল লিড হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার প্রতি সম্মান জানিয়ে গ্রেস ও তার সঙ্গী স্টিভ পাওয়েল তাদের সন্তানের মাঝের নাম রেখেছেন রিচার্ড।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্কও করছেন। জরায়ু প্রতিস্থাপন এখনো অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি প্রক্রিয়া। অস্ত্রোপচারের পর গ্রহীতাকে দীর্ঘদিন ইমিউনোসাপ্রেসিভ ওষুধ সেবন করতে হয়, যাতে শরীর নতুন অঙ্গটিকে প্রত্যাখ্যান না করে। পাশাপাশি মা ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েও নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। নৈতিকতার প্রশ্নও এখানে রয়েছে। মৃত দাতার অঙ্গ ব্যবহারে পরিবারের সম্মতি, অঙ্গ-দানের নীতিমালা এবং চিকিৎসার ন্যায়সঙ্গত প্রাপ্যতা—সবই আলোচনায় এসেছে। তবে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মতে, সঠিক নীতিমালা ও চিকিৎসা-নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে এটি বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসায় বিপ্লব ঘটাতে পারে।
নবজাতক শিশুটিকে কোলে নিয়ে মায়ের হাসিমুখ যেন শুধু ব্যক্তিগত আনন্দের ছবি নয়— এটি মানবিক স্বপ্ন, বিজ্ঞান ও অধ্যবসায়ের এক অনন্য সম্মিলন। মাতৃত্বের সংজ্ঞা হয়তো বদলাচ্ছে না, কিন্তু সেই পথে পৌঁছানোর উপায়ে যোগ হচ্ছে নতুন অধ্যায়।



