ফ্যামিলি কার্ড: নারীর হাতে ক্ষমতা, পরিবারের অগ্রযাত্রা

দেশে দারিদ্র্য এখনো কোটি মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার অংশ। রান্নার হাঁড়িতে চাল আছে কি নেই, সন্তানের বই-খাতা কিনতে পারবে কি না, হঠাৎ অসুস্থ হলে চিকিৎসার খরচ আসবে কোথা থেকে—এই প্রশ্নগুলোর ভার সবচেয়ে বেশি এসে পড়ে নারীদের ওপর। গ্রামীণ ও নগর মিলিয়ে লাখ লাখ নারী নীরবে পরিবারের জন্য নিজেদের প্রয়োজন পিছিয়ে রাখেন। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক সুরক্ষার বিভিন্ন কর্মসূচিতে নারীদের দেখা গেছে কেবল সহায়তার প্রাপক হিসেবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী বা অর্থনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে নয়।
ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো এই বাস্তবতা পরিবর্তন করা। সরকারের নতুন সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগটি নারীর হাতে খাদ্যনির্ভরতা ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ তুলে দেয়ার মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায়ন করবে। নারীর ক্ষমতায়ন মানেই শক্তিশালী পরিবার, আর শক্তিশালী পরিবার মানেই শক্তিশালী বাংলাদেশ।
ঝালকাঠির গ্রামের রাশিদা বেগমের গল্প প্রকল্পের প্রয়োজন বোঝায়। স্বামীর দিনমজুরির আয় দিয়ে সংসার চলানো কঠিন। একদিন রান্নার জন্য ভাত আর ডাল ছাড়া কিছু নেই এবং সেই সাথে সহ্য করতে হয় স্বামীর রাগ-গালাগাল। খাবারের অভাব তখন শুধু ক্ষুধা নয়, তা হয়ে ওঠে অপমান ও মানসিক চাপের কারণ। রাশিদার মতো অসংখ্য নারী নিজস্ব প্রয়োজন সামলিয়ে পরিবারকে এগিয়ে নিয়ে যান।
ফ্যামিলি কার্ড এই নীরব শ্রমকে স্বীকৃতি দেবে এবং নারীর হাতে খাদ্য ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তুলে দেবে।
প্রতিটি পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক নারী সদস্যের নামে ইলেকট্রনিক ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে। কারণ, নারীই পরিবারের খরচের সবচেয়ে বাস্তব ও দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপক। কার্ডের মাধ্যমে পরিবার মাসে দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা সমমূল্যের খাদ্যসহায়তা পাবে। এই সহায়তা নগদ অর্থ বা নির্দিষ্ট খাদ্যপণ্যের মাধ্যমে হতে পারে—যেমন চাল, আটা, ডাল ও ভোজ্যতেল।
এতে পরিবারের ন্যূনতম খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, খরচের ভার নারীর হাতে থাকায় তিনি নিজেই খাদ্য ও অর্থের ব্যবস্থাপনা করতে পারবেন। পাশাপাশি নারীরা ছোট উদ্যোগেও অংশ নিতে পারবেন—হাঁস-মুরগি পালন, সবজি চাষ, সেলাই বা ক্ষুদ্র ব্যবসা। অর্থাৎ ফ্যামিলি কার্ড শুধু সহায়তা নয়; এটি আত্মনির্ভরতার বীজ। এটি একটি আধুনিক, নারীকেন্দ্রিক ও মর্যাদাভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ।
এই উদ্যোগ সরাসরি পুরো দেশে চাপিয়ে দেওয়া হবে না। প্রথমে নির্বাচিত উপজেলা পর্যায়ে পাইলট প্রকল্প চালানো হবে। পাইলটের মাধ্যমে দেখা হবে—মানুষ নগদ অর্থ পছন্দ করছে নাকি খাদ্যসহায়তা, কোন পদ্ধতিতে দুর্নীতি কম, কোনটিতে প্রশাসনিক ব্যয় কম। পাইলট সফল হলে পর্যায়ক্রমে সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হবে।
পরিকল্পনায় রয়েছে—বর্তমান বাজেট ও বরাদ্দ ব্যবহার করে কার্যক্রম পরিচালনা, দুর্নীতি ও অপচয় কমানো এবং বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের মতো উন্নয়ন সহযোগীদের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা গ্রহণ।
সামাজিক নীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীর হাতে সরাসরি সহায়তা দিলে তার সুফল পরিবার ও সমাজেও পৌঁছে যায়। এটি সন্তানের শিক্ষা, পরিবারের পুষ্টি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ায়। নারীর হাতে ক্ষমতা থাকলে দারিদ্র্য চক্র ভাঙা সম্ভব। ফ্যামিলি কার্ড শুধু খাদ্য সহায়তা নয়, নারীর ক্ষমতায়ন এবং পরিবারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে। এতে প্রতিটি নারী হবে পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু।
ফ্যামিলি কার্ডের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো এর সর্বজনীন বা ব্ল্যাঙ্কেট–পদ্ধতি। এখানে কারও নাম বাছাই করে তালিকায় তোলার প্রয়োজন হবে না। কারণ, অভিজ্ঞতা বলছে—যেখানে বাছাই থাকে, সেখানে পক্ষপাত থাকে, দুর্নীতি থাকে, বাদ পড়ার ভয় থাকে। ফ্যামিলি কার্ড সবার জন্য। এতে কাউকে বেঁচে থাকার জন্য রাজনৈতিক পরিচয়, তদবির বা সুপারিশ খুঁজতে হবে না। অধিকার যখন সর্বজনীন হয়, তখন মর্যাদাও সর্বজনীন হয়।
পৃথিবীর নানা দেশে নারীর হাতে সরাসরি সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে—নারীর হাতে সহায়তা থাকলে তা অপচয় হয় না, বরং পরিবার ও সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগে রূপান্তরিত হয়। বাংলাদেশের ১৯৯২-৯৩ সালের খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা কর্মসূচিও সেই উদাহরণ।
ফ্যামিলি কার্ড কোনো দয়ার কর্মসূচি নয়। এটি একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ যা বলে নারী কেবল সহায়তার প্রাপকা নয় বরং উন্নয়নের অংশীদার। নারীর হাতে ক্ষমতা থাকলে পরিবার শক্তিশালী হয়, পরিবার শক্তিশালী হলে রাষ্ট্র স্থিতিশীল হয়।



