বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬
নারী

অস্কারে মনোনীত ইরানের অকুতোভয় ধাত্রী: মোটরসাইকেলে চড়ে সমাজ বদলের গল্প ‘কাটিং থ্রু রকস’

cutting-through-rocks 2

ইরানের দুর্গম পাহাড়ি পথ আর পাথুরে সামাজিক প্রথা—দুইই বুক চিরে জয় করেছেন এক নারী। নাম তার সারা শাহভারদি। তিনি পেশায় একজন ধাত্রী, নেশায় সমাজকর্মী, আর বাহন হিসেবে বেছে নিয়েছেন মোটরসাইকেল। তার জীবনের অবিশ্বাস্য সংগ্রাম আর সাফল্যের এই মহাকাব্য এবার উঠে এসেছে রুপালি পর্দায়।

সারা খাকি এবং মোহাম্মদরেজা আইনির পরিচালনায় ইতিহাস গড়া প্রামাণ্যচিত্র ‘কাটিং থ্রু রকস’ প্রথম ইরানি প্রামাণ্যচিত্র হিসেবে মনোনীত হয়েছে একাডেমি অ্যাওয়ার্ড বা অস্কারের সেরা প্রামাণ্যচিত্র বিভাগে।

৪০০ শিশুর জন্মধাত্রী ও একমাত্র নারী কাউন্সিলর

ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জাঞ্জান প্রদেশের একটি দুর্গম গ্রাম। সেখানে সারা শাহভারদি এক পরিচিত নাম। ওই অঞ্চলের একমাত্র নারী মোটরসাইকেল আরোহী হিসেবে তিনি গ্রাম থেকে গ্রামে ছুটে বেড়ান। একজন ধাত্রী হিসেবে এ পর্যন্ত প্রায় ৪০০ শিশুর নিরাপদ জন্ম নিশ্চিত করেছেন তিনি। কিন্তু তার লড়াই শুধু প্রসূতি সেবায় সীমাবদ্ধ থাকেনি।

সারা নির্বাচনে অংশ নেন এবং জাঞ্জান অঞ্চলের ৩০০টি গ্রাম কাউন্সিলের ১,৫০০ পুরুষ সদস্যের মধ্যে একমাত্র নারী হিসেবে সর্বোচ্চ ভোটে জয়লাভ করেন। তার হাত ধরেই ওই জনপদে পৌঁছেছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংযোগ। তিনি লড়াই করছেন বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে এবং সম্পত্তিতে নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য।

প্রতিবাদের ভাষা ক্যামেরা

পরিচালক সারা খাকি ও মোহাম্মদরেজা আইনি দীর্ঘ আট বছর ধরে শাহভারদির জীবনকে ক্যামেরাবন্দি করেছেন। সিনেমাটি নির্মাণ করতে গিয়ে নির্মাতাদের পোহাতে হয়েছে নানা ঝক্কি। হার্ড ড্রাইভ বাজেয়াপ্ত হওয়া থেকে শুরু করে দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞার মতো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে তাদের। এমনকি নির্মাণের এই দীর্ঘ যাত্রাপথেই দুই পরিচালক বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

নিজের পরিচয় নিয়ে লড়াই

সিনেমায় একটি হৃদয়বিদারক দৃশ্য ফুটে উঠেছে, যেখানে শাহভারদি ১২ বছর বয়সে বিয়ে হওয়া এক কিশোরীকে আশ্রয় দেওয়ায় প্রশাসনের কোপানলে পড়েন। ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ড’ ও ‘পুরুষালি পোশাক’ পরার অভিযোগে তাকে আদালতে তলব করা হয়। এমনকি তার লিঙ্গ পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাকে বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো হয়। তবে অদম্য শাহভারদি আদালতে সাফ জানিয়ে দেন, ‘আমি আমার লিঙ্গ পরিচয় নিয়ে গর্বিত।’ শেষ পর্যন্ত আদালত মামলাটি খারিজ করতে বাধ্য হয়।

অস্কারের পথে এক টকমিষ্টি যাত্রা

গত ২২ জানুয়ারি যখন এই প্রামাণ্যচিত্রটি অস্কারের জন্য মনোনীত হয়, তখন ইরানে ইন্টারনেটের ওপর কড়াকড়ি ও অস্থির পরিবেশ বিরাজ করছিল। খবরটি পৌঁছাতে দেরি হলেও শাহভারদি যখন তা জানতে পারেন, তখন তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। ভিসা জটিলতায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অস্কারের লাল গালিচায় হাঁটতে না পারলেও দক্ষিণ কোরিয়ার চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিয়ে বিশ্ববাসীর তালি কুড়িয়েছেন।

পরিবর্তনের হাওয়া

শাহভারদির লড়াই বিফলে যায়নি। প্রামাণ্যচিত্রটির প্রিমিয়ারের পর দেখা গেছে তার গ্রামে বড় ধরনের পরিবর্তন। এখন সেখানে আরও বেশি নারী স্থানীয় কাউন্সিলে অংশ নিচ্ছেন, কিশোরীরা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পরিবারের সমর্থন পাচ্ছে। চার বছরের কাউন্সিল পদের মেয়াদ শেষ হলেও সারা শাহভারদি দমে যাননি; বর্তমানে তিনি একটি বালিকা বিদ্যালয় নির্মাণের কাজ তদারকি করছেন।

‘কাটিং থ্রু রকস’ শুধু একটি সিনেমা নয়, এটি ইরানের হাজারো নারীর নীরব বিপ্লবের প্রতিচ্ছবি, যা এখন বিশ্বমঞ্চে সমাদৃত।

অস্কারইরানধাত্রীমোটরসাইকেল