দ্বিতীয় বিয়ে: আইন কী বলে, বিভ্রান্তি কোথায়

দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি বাধ্যতামূলক নয়—সম্প্রতি উচ্চ আদালতের একটি রায়কে ঘিরে এমন ব্যাখ্যা গণমাধ্যমে আসার পর বিষয়টি নিয়ে জনমনে নতুন করে প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এতে নারীর অধিকার আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। মানবাধিকারকর্মীদের একাংশ বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, আবার কেউ কেউ আইন সংস্কারের কথাও ভাবছেন।
তাহলে বাস্তবে আইন কী বলে? বিয়ে বহাল থাকা অবস্থায় কি ইচ্ছামতো দ্বিতীয় বিয়ে করা যায়? আর দ্বিতীয় বিয়ের হুমকি দিয়ে প্রথম স্ত্রীকে মানসিক চাপে রাখার বিষয়টি কি আইনের চোখে গ্রহণযোগ্য? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তিনজন বিশিষ্ট ব্যক্তির মতামত বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
সালিশি পরিষদের অনুমোদন বাধ্যতামূলক
মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী সুলতানা কামাল বলেন, মুসলিম পারিবারিক আইন (১৯৬১)-এ সরাসরি কোথাও লেখা নেই যে দ্বিতীয় বিয়ের জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নিতে হবে। তবে আইনটি পরিষ্কারভাবে বলছে—একাধিক বিয়ে করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অবশ্যই সালিশি পরিষদের (আরবিট্রেশন কাউন্সিল) অনুমোদন নিতে হবে।
এই পরিষদ বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে দেখে। সাধারণত স্ত্রীর সন্তান ধারণে অক্ষমতা বা বিশেষ কোনো পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। সালিশি পরিষদ স্ত্রীপক্ষের বক্তব্যও শোনে এবং সব দিক বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত দেয়।
তিনি জানান, সালিশি পরিষদের অনুমতি ছাড়া কেউ দ্বিতীয় বিয়ে করলে শাস্তির বিধান আছে—এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। তবে বড় অসংগতি হলো, এমন বিয়েও আইনের চোখে বাতিল হয় না। এই জায়গাটিই দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে।
আইনটি ভারসাম্যপূর্ণ, কিন্তু প্রয়োগ দুর্বল
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ হাসনাত কাইয়ূম মনে করেন, ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন আমাদের সমাজের বাস্তবতায় মোটামুটি ভারসাম্যপূর্ণ। সমস্যা আইনে নয়, সমস্যা এর প্রয়োগে।
তিনি বলেন, সমাজে একটি অংশ ইসলামের দোহাই দিয়ে নারীদের উত্তরাধিকার ও অন্যান্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করছে। অথচ বিদ্যমান আইনগুলো সঠিকভাবে কার্যকর হলে নারীরা অনেকটাই সুরক্ষা পেতেন।
তার মতে, দ্বিতীয় বিয়ে করা মোটেও সহজ কোনো বিষয় নয়। প্রথম স্ত্রী শারীরিকভাবে অক্ষম বা সন্তান জন্মদানে অক্ষম হলে বিশেষ শর্তে দ্বিতীয় বিয়ের সুযোগ আসে। এটিকে সাধারণ নিয়ম হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
তিনি আরও বলেন, আইনকে অতিরিক্ত কড়াকড়ি করলে অনেক সময় দাম্পত্য জীবনে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই এই আইনকে মোটের ওপর ভারসাম্যপূর্ণ বলেই মনে করেন তিনি।
সময় এসেছে আইন নতুন করে ভাবার
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফৌজিয়া মোসলেম মনে করেন, ১৯৬১ সালে যে বাস্তবতায় আইনটি করা হয়েছিল, আজকের সমাজ বাস্তবতা তার থেকে অনেক আলাদা। বর্তমানে এই আইন নারীর মানবাধিকার রক্ষায় কতটা কার্যকর—তা নতুন করে মূল্যায়ন করা জরুরি।
তিনি বলেন, অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে শাস্তির বিধান থাকলেও বিয়ে বহাল থাকে—এটি নারীর জন্য বড় দুর্বলতা তৈরি করে। সাম্প্রতিক আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে তারা রায়ের কপি সংগ্রহ করে বিষয়টি পর্যালোচনা করছেন।
তার ভাষায়, আগে এই আইন প্রয়োগের মাধ্যমে কিছুটা হলেও নারীরা সুরক্ষা পেতেন। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে আইনকে আরও যুগোপযোগী করার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হচ্ছে। এ নিয়ে আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে।



