শিল্পকলায় শুরু মর্যাদাপূর্ণ আলোকচিত্র উৎসব ‘ছবি মেলা’

শীতের দুপুর তখনো নরম রোদের উষ্ণতা ছড়াচ্ছে। রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনের ব্যস্ত সড়কে দেখা গেল এক ব্যতিক্রমী দৃশ্য। কোনো স্লোগান নেই, নেই উচ্চকণ্ঠের আওয়াজ—তবু দৃঢ় পদচারণায় এগিয়ে চলেছেন দেশি-বিদেশি আলোকচিত্রী, শিল্পী ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা। তাদের গন্তব্য বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি এশিয়ার অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আলোকচিত্র উৎসব ১১তম ‘ছবি মেলা’।
গতকাল শুক্রবার বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র উৎসব। দৃক পিকচার লাইব্রেরি ও পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউটের যৌথ উদ্যোগে ২০০০ সাল থেকে নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে এই আয়োজন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছবি মেলা কেবল একটি প্রদর্শনী নয়, বরং বিশ্বজুড়ে শিল্পী ও চিন্তকদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা অডিটোরিয়ামে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উৎসবের প্রধান উপদেষ্টা ও প্রখ্যাত আলোকচিত্রী শহিদুল আলম বলেন, ছবি মেলাকে শুধুই উৎসব হিসেবে দেখলে তার ব্যাপ্তি বোঝা যাবে না। তাঁর ভাষায়, এটি একটি আন্দোলন, একটি প্রতিরোধ এবং একই সঙ্গে একটি জাগরণের নাম—যার লক্ষ্য নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার স্বপ্নকে এগিয়ে নেওয়া।
অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী আলোকচিত্রকে দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক চর্চায় যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন। তবে তিনি জানান, এই অবস্থার পরিবর্তন আসছে। শিল্পকলা একাডেমিতে বিভাগ সম্প্রসারণের জন্য সম্প্রতি একটি অধ্যাদেশ পাস হয়েছে, যার ফলে আলোকচিত্র বিভাগ এখন থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে। ঢাকাসহ দেশের আটটি বিভাগে এই কার্যক্রম ছড়িয়ে দিতে দৃক ও পাঠশালাকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন ও উৎসব পরিচালক এএসএম রেজাউর রহমান। কিউরেটরিয়াল নোট উপস্থাপন করেন আর্টিস্টিক ডিরেক্টর মুনেম ওয়াসিফ ও সরকার প্রতীক।
এবারের ছবি মেলার প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘পুনঃ’। ছোট এই শব্দের অর্থবহ বিস্তৃতি বড়—আবার শুরু করা, নতুনভাবে ভাবা, কিংবা ভিন্নভাবে ফিরে দেখা। এই ভাবনাকে কেন্দ্র করেই সাজানো হয়েছে এবারের আয়োজন। পাঁচটি মহাদেশের ১৮টি দেশ থেকে ৫৮ জন শিল্পী তাদের কাজ নিয়ে অংশ নিয়েছেন এই উৎসবে।
উৎসবটি ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকার পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে—বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা, দৃকপাঠ ভবন এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সাউথ প্লাজা। ১৬ দিনব্যাপী এই আয়োজনে মোট ৯টি প্রদর্শনী উপভোগ করতে পারবেন দর্শনার্থীরা।
উদ্বোধনের দিন বিকেলেই অনুষ্ঠিত হয় ‘আর্ট অ্যাজ রেজিস্ট্যান্স’ শীর্ষক আলোচনা। এতে শহিদুল আলমের সঙ্গে অংশ নেন প্রখ্যাত আলোকচিত্র সাংবাদিক গ্যারি নাইট, আলোকচিত্রী মুহাম্মদ সালাহ আব্দুল আজিজ, কিউরেটর তানভি মিশ্রা ও ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট ইয়াসমিন ইদ-সাব্বাহ।
প্রদর্শনীর পাশাপাশি এবারের ছবি মেলায় থাকছে আর্টিস্ট টক, প্যানেল আলোচনা ও লেকচার। তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করতে ২৫ থেকে ২৯ জানুয়ারির মধ্যে স্থানীয় স্কুলগুলোতে বিশেষ শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হবে, যেখানে সহস্রাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেবে। এ ছাড়া ছয়টি ইনটেনসিভ কর্মশালায় আলোকচিত্রের কারিগরি ও নান্দনিক দিক নিয়ে গভীরভাবে শেখার সুযোগ থাকছে।
আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে এই উৎসব। নগর জীবনের ব্যস্ততা আর কোলাহলের মাঝে শিল্প ও চিন্তার একটুখানি প্রশান্তির খোঁজে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য উন্মুক্ত থাকছে এই আলোকচিত্রের মহাযজ্ঞ।



