বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬
স্পটলাইট

বহুবিয়ে সহজ হলে নারীর ক্ষমতায়ন বাধাগ্রস্ত হবে

IMG-20260116-WA0003

গত ১১ জানুয়ারি মুসলমানদের দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনি বিধান নিয়ে গত বছরের ২০ আগস্ট দেওয়া উচ্চ আদালতের একটি রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশ্যে এসেছে, যদিও পূর্ণাঙ্গ রায়টি সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা গত বছরের ১২ ডিসেম্বরেই পেয়েছিলেন বলে তারা জানিয়েছেন। এরপর থেকে এ নিয়ে, বিশেষত সামাজিক মাধ্যমে চলছে আলোচনা ও বিতর্ক। এ বিষয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ফটোকার্ডে বলা হয়েছে, এখন থেকে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়াই আবার বিয়ে করা যাবে। এর আগে আমরা জানতাম, স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এ বিষয়ে প্রথম স্ত্রীর সম্মতি নিতে হতো, যা আইয়ুব খানের আমলে সংস্কারকৃত ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনের সঙ্গেই যুক্ত। এ ধরনের বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি না নিলে আইনিভাবে শাস্তির ব্যবস্থা ছিল, আর্থিক জরিমানার পাশাপাশি জেলে যেতে হতো, তবে বিয়ে অবৈধ সাব্যস্ত হতো না। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিয়ে কিংবা বহুবিয়েকে নিরুৎসাহিত করার একটা প্রক্রিয়া ছিল।

রায় ও আইনটি নিয়ে খোদ আইনজীবীদের মধ্যে মতভেদ দেখা যাচ্ছে। যেমন গত ১২ জানুয়ারি প্রকাশিত বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুনরায় বিয়ের ক্ষেত্রে মুসলিম পারিবারিক আইনে আগে যে নিয়ম ছিল, হাইকোর্টের রায়ে সেটিই বহাল রইল বলে জানিয়েছেন আইনজীবী মিতি সানজানা ও অধ্যাপক আবু নাসের মো. ওয়াহিদ। মিতি সানজানা বলছেন, ‘আরবিট্রেশন কাউন্সিল বা সালিশি পরিষদের লিখিত অনুমতি ছাড়া কোনো বিয়ে নিবন্ধিত হবে না। আবার ওই কাউন্সিলে কাউকে পুনরায় বিয়ের আবেদন করতে হলে অবশ্যই আবেদনের সঙ্গে বিদ্যমান স্ত্রীর সম্মতির বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।’ একই সুরে অধ্যাপক আবু নাসের মো. ওয়াহিদও বলেছেন, ‘বাংলাদেশে বিয়ের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রি করার জন্য আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আর রেজিস্ট্রি করতে হলে সালিশি পরিষদের অনুমতি নিতে হবে। আবার এ অনুমতির আবেদনের শর্তগুলোর মধ্যে একটি হলো বিদ্যমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্মতি নেওয়া।’ অন্যদিকে একই দিনে সমকালের এক প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট রিটকারী আইনজীবী ইশরাত হাসানের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেছেন, মুসলিমদের পুনরায় বিয়ের ক্ষেত্রে আরবিট্রেশন কাউন্সিল বা সালিশি পরিষদের লিখিত অনুমতির যে বিধান বিদ্যমান আইনে ছিল, সেটিই ওই রায়ে বহাল রাখা হয়েছে এবং মূল আইনে প্রথম স্ত্রীর অনুমতির বিষয়টি ছিল না।

ইশরাত হাসান বলেন, ‘মূলত ১৯৬১ সালের আইনে ছিল দ্বিতীয় বিয়ে করতে হলে সালিশি কাউন্সিলের অনুমতি নিতে হবে, বর্তমান স্ত্রীর নয়। সেটি আমরা চ্যালেঞ্জ করেছিলাম।’ এলিনা খান বলেন, ‘সালিশি কাউন্সিলের অনুমতি ছাড়া কেউ দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবেন না, হাইকোর্টের দেওয়া এই রায় সঠিক আছে। … প্রথম স্ত্রীর অনুমতি লাগবে, এটি কোথাও নেই।’

প্রতিবেদন থেকে বোঝা যায়, রিটে প্রথম স্ত্রীর কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করতে চাওয়া হয়েছিল, যা নাকচ হয়ে গেছে রায়ে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন বলেছেন।

Advertisements

আমার মতে, এভাবে নারীর কণ্ঠস্বর গৌণ হয়ে গেলে তার স্বাধীন কর্তাসত্তাও দুর্বল হয়ে পড়বে। তবে আমি এখানে আইনি ব্যাপারগুলো বিস্তারিত লিখতে পারছি না, কারণ এগুলো আইনজীবীরা ভালো বুঝবেন। আমি এখানে প্রধানত সামাজিক ক্ষেত্রে নারীর অবস্থানকে গুরুত্ব দিয়ে কয়েকটি মন্তব্য তুলে ধরব।

এমনিতেই আমাদের সমাজ পুরুষতান্ত্রিক এবং সামাজিকভাবে নারীর কণ্ঠস্বর এখানে দমিয়ে রাখা হয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও বেশির ভাগ সিদ্ধান্ত এখনও পুরুষের অধীন। ফলে আপাতদৃষ্টিতে জনপরিসরে যেভাবে নারীর সম্পৃক্ততা দেখা যায়, সত্যিকার অর্থে নারীর ক্ষমতায়ন সেভাবে শক্তিশালী নয়। দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রেও বিদ্যমান বিধান অনুযায়ী পুরুষতান্ত্রিক সমাজই শক্তিশালী হবে। কেননা আমাদের সমাজে সালিশ পরিষদ নিয়ন্ত্রণ করে পুরুষরা। এটি জোরালোভাবে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যেখানে ন্যায়বিচার পাওয়া দুরূহ ব্যাপার।

পত্রপত্রিকায় প্রতিদিনই আমরা দেখতে পাই কীভাবে একজন নির্যাতিত নারী বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামোর কাছে দুর্বল। নারী নির্যাতনের ঘটনায় দুই হাজার, পাঁচ হাজার টাকায় সালিশে জবরদস্তিমূলক মীমাংসা হয়ে যাচ্ছে, যেখানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভুক্তভোগী নারী। এমন পরিস্থিতিতে একজন স্বামীর একাধিক বিয়ের সিদ্ধান্ত শুধু সালিশ পরিষদের অধীনে অর্পণ করার সিদ্ধান্ত যেমন বিদ্যমান পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোকে শক্তিশালী করবে, তেমনি এতে দুর্বল হবে নারীরা।

আমাকে একজন আইনজীবী জানিয়েছেন, মূলত দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে সালিশি বোর্ড যাচাই করে দেখবে প্রথম স্ত্রীর অনুমোদন আছে কিনা। তাঁর মতে, একজন ব্যক্তি চাইলেই দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবেন না, কারণ এ ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়ম রয়েছে। সালিশি পরিষদ পর্যালোচনা ও যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত দেবে। ফলে সালিশি বোর্ড চাইলেই দ্বিতীয় বিয়ের সিদ্ধান্ত দিতে পারে না, বরং কেবল শর্তগুলো যথাযথভাবে পূরণ করতে পারলেই বোর্ড এ সিদ্ধান্ত দেবে। এ ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অনুমোদনও বিবেচ্য বিষয়।

আইনি ভাষা এমনিতে দুরূহ এবং আমরা তা এখন পর্যন্ত জনসাধারণের কাছে সহজ ভাষায় পৌঁছাতে পারিনি। তার ওপর আরও বিভ্রান্তি ছড়ানো অনাকাঙ্ক্ষিত, তবে মানুষের সচেতনতা বাড়াতে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ ব্যাপারে আরও আন্তরিক হয়ে তথ্যগুলো সামনে আনতে হবে। দ্বিতীয় বিয়ের ব্যাপারে কোর্ট যে রায় দিয়েছেন, তা কেবল আইনজীবীদের হাতে সীমাবদ্ধ না থেকে বরং জনসাধারণের কাছে সহজ ভাষায় পৌঁছে যাক। এর বিরুদ্ধে আপিল হোক। এ ছাড়া নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নে যেসব বিষয় যুক্ত, সেগুলো সরকার আরও সংবেদনশীলতার সঙ্গে বিবেচনায় নেবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।

Advertisements