বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬
স্পটলাইট

রোল ২২ থেকে দ্বিতীয়, ফল দেখার আগেই নিভে গেল আয়েশার জীবন

IMG-20260104-WA0034

বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। তাতে দেখা যায়, রোল নম্বর ২২—আয়েশা আক্তার তৃতীয় শ্রেণিতে দ্বিতীয় হয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। এই সাফল্যে যেখানে স্কুলজুড়ে আনন্দের কথা, সেখানে বাস্তবতা একেবারেই উল্টো। শিক্ষক, সহপাঠী কিংবা পরিবার—কারও মুখেই হাসি নেই, আছে শুধু নীরব শোক।


কারণ, এই ফলাফল দেখার জন্য আর বেঁচে নেই আয়েশা। নতুন বই-খাতা হাতে তৃতীয় শ্রেণির ক্লাসে বসে রোলকল শুনে ‘উপস্থিত’ বলার সুযোগ আর হবে না তার। রাতের আঁধারে ঘরের ভেতর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছে সাত বছরের এই শিশুটি। ফলে তার সাফল্যের খবর এখন শুধুই বেদনার স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে।


আয়েশার বাবা বেলাল হোসেন গত বৃহস্পতিবার মুঠোফোনে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মেয়ের রেজাল্ট ভালো হইছে, সেকেন্ড হইছে। কিন্তু এই রেজাল্ট দিয়া এখন আর কী হবে?’

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ ইউনিয়নের চরমনসা গ্রামের সূতারগোপ্টা এলাকার বাসিন্দা বেলাল হোসেনের তিন মেয়ের মধ্যে আয়েশা ছিল সবার ছোট। তিনি ভবানীগঞ্জ ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক। স্থানীয় সূতারগোপ্টা বাজারে তাঁর সারের ব্যবসা রয়েছে।

Advertisements

ঘরের ভেতর আগুন, শিশুর শেষ আকুতি

গত ১৯ ডিসেম্বর গভীর রাতে বেলাল হোসেনের বাড়িতে আগুন লাগে। তাঁর অভিযোগ, বাইরে থেকে ঘরের দরজায় তালা লাগিয়ে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। সেই আগুনেই পুড়ে মারা যায় ছোট্ট আয়েশা।

সেদিন রাতে পাকা ভিত্তির চৌচালা টিনের বাড়ির তিনটি কক্ষে ঘুমাচ্ছিলেন বেলাল হোসেন, তাঁর স্ত্রী নাজমা বেগম, তিন মেয়ে ও দুই ছেলে। আগুন লাগার পর তিনি স্ত্রী, চার বছর বয়সী ছেলে নাজমুল ইসলাম, চার মাস বয়সী ছেলে নজরুল ইসলাম এবং দুই বড় মেয়েকে টিনের বেড়া উঁচু করে কোনোভাবে বের করতে সক্ষম হন।

কিন্তু ছোট মেয়েটিকে আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। আগুনের ভেতর থেকে বাবাকে বাঁচানোর জন্য ডাকছিল আয়েশা। তীব্র আগুনে কাছে যাওয়া সম্ভব না হওয়ায় বাবার চোখের সামনেই প্রাণ হারায় শিশুটি।

মাত্র ছয় দিনের ব্যবধানে দুই মেয়েকে হারান বেলাল হোসেন ও নাজমা বেগম। আগুনে আহত মেজ মেয়ে সামিয়া আক্তারের শরীরের প্রায় ২ শতাংশ পুড়লেও তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়নি।

বেলাল হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন,‘যার দুইটা সন্তান একসঙ্গে মারা যায়, তার আর কী থাকে? এক মেয়েকে ১৮ বছর ধরে বড় করলাম, বিয়ে দিলাম। আরেকটা মেয়েকে চোখের সামনে বড় হতে দেখছিলাম। ছোট মেয়েটা আব্বু আব্বু ডাইকা বাঁচতে চাইছিল।’

তিনি আরও জানান, বড় মেয়ের মৃত্যুর এক ঘণ্টা আগেও ভিডিও কলে কথা হয়েছিল। মেয়েটি বলেছিল, ঢাকায় যাওয়ার দরকার নেই, সে নিজেই বাড়ি চলে আসবে।

শারীরিক অসুস্থতার কারণে ছোট মেয়ে আয়েশার জানাজা ও দাফনের সময় সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন বেলাল হোসেন। তিনি জানাজায় অংশ নিতে পারেননি। বড় মেয়ের মৃত্যুর খবর পেয়েও আইসিইউতে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

দুই মেয়েকে পাশাপাশি কবর দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

Advertisements