বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬
নারী

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরে খালেদা জিয়ার ভূমিকা

Untitled-2

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৫ বছরে রাষ্ট্র নির্মাণ, রাজনৈতিক রূপান্তর এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের নানা অধ্যায় পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই দীর্ঘ সময়পর্বে দেশ একাধিক রাজনৈতিক মোড় অতিক্রম করেছে, যার প্রতিটিই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে। এই ধারাবাহিক ইতিহাসের ভেতর বেগম খালেদা জিয়ার শাসনকাল একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—বিশেষ করে অর্থনৈতিক সংস্কার ও নীতিগত পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে।

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বকাল এমন এক সময়ে শুরু হয়, যখন বাংলাদেশ ধীরে ধীরে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে সরে এসে বাজারভিত্তিক ও রপ্তানিনির্ভর উন্নয়ন মডেলের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। এটি কেবল কিছু নীতিগত পরিবর্তনের সময় ছিল না; বরং রাষ্ট্র, বাজার ও সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব ছিল। তাই তাঁর অর্থনৈতিক ভূমিকা মূল্যায়ন করতে হলে একে বৃহত্তর জাতীয় রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে, একটি চলমান বিবর্তনের অংশ হিসেবে দেখতে হয়।

১৯৯১ সালে ক্ষমতায় আসার সময় বাংলাদেশ সদ্য সামরিক শাসন থেকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে এসেছে। তখন অর্থনীতি সীমিত উৎপাদনক্ষমতা, দুর্বল রাজস্ব কাঠামো ও অতিনিয়ন্ত্রণমূলক নীতির ভারে জর্জরিত ছিল। এই বাস্তবতায় খালেদা জিয়ার সরকার ব্যক্তি খাতকে উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করে একটি ভিন্ন পথ বেছে নেয়। বাজারের ভূমিকা সম্প্রসারণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং রাষ্ট্রকে সরাসরি নিয়ন্ত্রকের বদলে সহায়ক শক্তি হিসেবে গড়ে তোলাই ছিল এই দর্শনের মূল কথা। এই সময় থেকেই বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি স্পষ্ট হতে শুরু করে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের সবচেয়ে দৃশ্যমান দিকগুলোর একটি হলো তৈরি পোশাকশিল্পের উত্থান। যদিও আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে এই শিল্পের সূচনা হয়েছিল, নব্বইয়ের দশকে এসে এটি কাঠামোগত নীতিগত সহায়তা পায়। বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি, নগদ প্রণোদনা এবং বাণিজ্য সহজীকরণমূলক নীতির মাধ্যমে সরকার রপ্তানিকারকদের কার্যকর সহায়তা প্রদান করে। এগুলো ছিল বাস্তব সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান, যার ফলে বাংলাদেশ দ্রুত বৈশ্বিক পোশাক সরবরাহ শৃঙ্খলে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়।

Advertisements

খালেদা জিয়ার প্রথম মেয়াদের আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ ছিল ১৯৯১ সালে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আইন প্রণয়ন। এটি বাংলাদেশের করব্যবস্থায় একটি মৌলিক রূপান্তর ঘটায়। সীমিত ও অকার্যকর কর কাঠামোর পরিবর্তে একটি আধুনিক ও বিস্তৃত রাজস্বব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়াস নেওয়া হয়। বাস্তবায়নে নানা চ্যালেঞ্জ থাকলেও এই উদ্যোগ রাজস্ব প্রশাসনের ভিত্তি শক্ত করে এবং উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা ও অবকাঠামো বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো নির্মাণে ভূমিকা রাখে।

বৈদেশিক লেনদেন ব্যবস্থায়ও তাঁর শাসনামলে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। ১৯৯৪ সালে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট কনভার্টিবিলিটি চালু হওয়ায় আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম আরও গতিশীল হয়। পরবর্তীকালে ২০০৩ সালে ভাসমান বিনিময় হার ব্যবস্থায় প্রবেশের মাধ্যমে বৈদেশিক বাণিজ্য ও মুদ্রানীতিতে নমনীয়তা আসে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ আরও কার্যকর হয়।

আর্থিক খাত সংস্কার ছিল এই সময়ের অন্যতম জটিল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ব্যাংক কোম্পানি আইন (১৯৯১) এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন (১৯৯৩) প্রণয়নের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ কাঠামো জোরদার করা হয়। একই সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় আর্থিক খাত সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়। কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পুরোপুরি অর্জিত না হলেও, এই সময়েই ব্যাংক ব্যবস্থাপনা ও তদারকির কাঠামোগত ভিত্তি তৈরি হয়। পুঁজিবাজারের প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) গঠনও ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

এই সময়কালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং প্রবাসী আয়ের প্রবাহ কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ায় এবং দারিদ্র্য হ্রাসে সহায়ক হয়। নব্বইয়ের দশক থেকে ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। যদিও এই অর্জন কোনো একক সরকারের নয়, তবু খালেদা জিয়ার সময়কার নীতিগত স্থিতিশীলতা এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।

অর্থনীতির বাইরে সামাজিক নীতির ক্ষেত্রেও তাঁর শাসনামল গুরুত্বপূর্ণ। নারীশিক্ষা বিস্তারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং ১৯৯৪ সালে মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের জন্য উপবৃত্তি কর্মসূচি চালু হওয়ায় বিদ্যালয়ে মেয়েদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি গ্রামীণ কর্মসংস্থান, খাদ্যনিরাপত্তা ও লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

সব মিলিয়ে, খালেদা জিয়ার শাসনামলে গৃহীত বহু অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতিমালা বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার হিসেবে রয়ে গেছে। যদিও এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ ছিল, তবু সেগুলো দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্ত করতে সহায়তা করেছে।

আজকের বাংলাদেশে শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা, বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলার অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্বল প্রয়োগব্যবস্থা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে সংস্কার কেবল নীতিনির্ধারণের বিষয় নয়; এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়।

Advertisements