Skip to content

২৮শে জুন, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ১৪ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

দেড় বছরে বিশ্বভ্রমণ করলেন একা যে নারী

নারীদের ঘরের বাইরে বের হওয়া নিয়ে রয়েছে নানা বিধিনিষেধ। ছোটোবেলা থেকেই তাদের শেখানো হয়, ‘তুমি মেয়ে, বাইরে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে বহু বিপদ। তোমার কাজ ঘরে থাকা।’ আর যদিও ঘর থেকে বের হওয়ার অনুমতি মিলে তাও সঙ্গে থাকতে হবে কারো। আর রাতের বেলায় মেয়ে বাইরে থাকবে? এ তো একদমই অসম্ভব।

এটি আমাদের সমাজের প্রতিদিনকার চিত্র। শুধু ঘরের বাইরে বের হওয়া নিয়ে প্রতিদিন রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয় অনেক মেয়েদের। আর সেখানে দেশের বাইরে? তাও একদমই একা একা, শুনলেই যেনো হার্টঅ্যাটাক হওয়ার জোগাড় হবে আমাদের সমাজের মানুষদের। কোনো মেয়ে যদি একা পুরো বিশ্ব ঘুরতে চায় তবে তাকে রুখতে প্রয়োজনে শেকল বাঁধবে সমাজের মানুষজন। তবুও বিশ্বে এমন কিছু মেয়ে আছে যারা নিজেদের আত্মবিশ্বাস দ্বারা সে শেকল ভেঙে সামনে এগিয়ে যায়।

তেমনি একজন অ্যামেরিকান নারী ‘ক্যাসি ডি পিকল’। শত বাঁধা পেরিয়ে তিনি পুরো বিশ্বে তৈরি করেছেন নতুন ইতিহাস যা তার আগে কেউ করতে পারেনি। ক্যাসি পৃথিবীর প্রথম কোনো নারী, যিনি বিশ্বের প্রতিটি দেশ ঘুরেছেন, তাও একা। শুধু তাই নয়, এই কাজটি তিনি করেছেনে বাকি সবার থেকে কম সময়ে। নাম লিখিয়েছেন গিনেস বুক ওয়ার্ল্ডে।

তবে এই সফলতার পথটাও নেহাত কম কঠিন ছিল না। ছোটোবেলা থেকেই ক্যাসি দেখতে পান, যেকোনো পরিকল্পনার শুরুতেই ক্যাসির শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছিল তার আশেপাশের মানুষ। যারা প্রতিনিয়ত তার সামনে একটা খারাপ বিশ্বকে তুলে ধরতো এবং তাকে সতর্ক করতো। তাকে মনে করানো হতো, সে যেকোনো মুহূর্তে ধর্ষণের শিকার হতে পারেন, এমনকি মারাও যেতে পারেন। বস্তুত এসবই ছিল ক্যাসিকে যেকোনো উপায়ে থামানোর পাঁয়তারা।

তবে ক্যাসি ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি পুরো বিশ্ব একা ঘুরতে চেয়েছিলেন এবং তাকে দেওয়া সবার মিথ্যে ভয়ও ভাঙতে চেয়েছিলেন। তিনি কারও পরামর্শ কিংবা উপদেশ নয় বরং নিজের মত প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তাই একদিন ক্যাসি সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি তার ভয়কে জয় করবেন, এমন কিছু করে যা এখনো কোনো নারী করে উঠতে পারেনি। আর সেজন্যই তিনি সিদ্ধান্ত নেন পুরো বিশ্ব একা ঘুরে দেখার। শুধু তাই নয় পাশাপাশি তিনি পুরুষদের রেকর্ডও ভাঙতে চেয়েছেন। এ যাবৎকালে যে কজনই এ রেকর্ড করেছেন, সবার চেয়ে কম সময়ে বিশ্ব ঘোরার পরিকল্পনা করেন তিনি।

তবে তার পুরো পরিকল্পনাটির জন্য সময় লেগেছিল পুরো তিন বছর। তার এই ট্রিপের জন্য তাকে বেশ অনেকগুলো পরিকল্পনা করতে হয়। যেমন, ভিসা, স্পনসর, ইনভেস্টর ইত্যাদি। গিনেস বুকে নাম লেখানোটা ছিল বিশাল একটি চ্যালেঞ্জ। সেখানে ছিল বেশ অনেকগুলো নিয়ম। যেমন, তিনি কোনো দেশে ১৪ দিনের বেশি সময় কাটাতে পারবেন না এবং তিনি শুধু ঘুরে এলেই হবে না; তার দরকার হবে ওই দেশে সশরীরে উপস্থিত থাকার প্রমাণ। সে তালিকায় কিন্তু রয়েছে উত্তর কোরিয়ার মতো দেশও।

এতসব চ্যালেঞ্জ দেখে প্রথমে ভয় পেলেও, ক্যাসি ভাবেন, তাকে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে এবং সফল হতে হবে। কারণ তিনি চেয়েছেন যেন তাকে দেখে বিশ্বের যেকোনো নারী বলতে পারে, ‘হ্যাঁ, আমরাও পারবো এগিয়ে যেতে।’

স্বভাবতই সবার মনে প্রশ্ন জাগবে, ‘পুরো বিশ্ব ঘুরতে ঠিক কত খরচ পরলো?’ উত্তর হলো, ‘মাত্র ১০ হাজার ডলার’। তার বাকি সব খরচের জন্য ছিল স্পনসর। এছাড়া, ক্যাসির কাছে ছিল পর্যাপ্ত পরিমাণে টাকা। তাই তিনি কোনো চিন্তা না করে বেরিয়ে পড়লেন তার যাত্রায় এবং সব চেয়ে কম সময়ে তিনি পুরো বিশ্বের ১৯৬টি দেশ ঘুরে রেকর্ড তৈরি করলেন। এমনকি নর্থ কোরিয়ার মতো রক্ষনশীল দেশও বাদ রাখেননি একা এই নারী। সে তালিকায় বাদ যায়নি যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান ও ইরানও।

তার ভ্রমণের সময়ে বেশ কিছু সমস্যায়ও পড়তে হয়েছে তাকে। দুবার জড়িয়েছেন পুলিশি ঝামেলায়। আর একজন নারী হিসেবে তার জন্য এসব ঝামেলা থেকে বের হওয়া ছিল খুবই কঠিন কাজ। তবে প্রত্যেকবারই সাহসিকতার সঙ্গে তিনি সব বাধা অতিক্রম করেছেন। ট্রিপের পুরো সময়টাতে তিনি তার, পরিবার ও বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়া কিংবা যেকোনো উপায়ে যোগাযোগ অবিচ্ছিন্ন রেখেছিলেন।

তার পুরো যাত্রা শেষে তিনি বেশ মজার অভিজ্ঞতাই শেয়ার করেছেন। তার এ পরিকল্পনার গোড়ার দিকে তাকে যে খারাপ পৃথিবীর ভয় দেখানো হয়েছিল তেমন কোনো কিছুর খোঁজই তিনি পাননি। পুরো বিশ্বজুড়ে তিনি মানবতার এক সুন্দর নিদর্শনই দেখেছেন। তিনি কোনো কোনো দেশের মেয়র, মন্ত্রীদের সঙ্গেও দেখা করেছেন। শুধু তাই নয় তার ভ্রমণকালে তিনি দেখা করেছেন স্পেনের রাজার সঙ্গেও।

যাই হোক, ক্যাসি পুরো বিশ্বভ্রমণ কত দিনে শেষ করেছিলেন, জানেন? মাত্র ১৮ মাস ১০ দিনে। অর্থাৎ মাত্র দেড় বছরের মধ্যেই তিনি তার ভ্রমণ শেষ করেছেন, যা আগে কেউ করতে পারেনি। এখানেই তিনি প্রমাণ করেছেন, ‘নারীরাও পারে।’ শুধু ঘরের বাইরে নয় তারা একা বিশ্বভ্রমণেও বেরোতে পারে, সফলতার গল্পও তৈরি করতে পারে। তাদের নিজস্ব কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। সমস্তটাই সমাজের বেঁধে দেওয়া। তাই মেয়েদের ভীতু হওয়ার শিক্ষা না দিয়ে বরং তাদের স্বপ্ন পূরণের জন্য উৎসাহ দেওয়া উচিত।

অনন্যা/জেএজে