বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনরবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২৬
নারী

সাহসী এক চা-কন্যা

11-2512111206

দুটি পাতা একটি কুড়ির দেশ মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলায় রয়েছে অসংখ্য চা বাগান। শ্রীমঙ্গলের ভাড়াউড়া চা বাগানের মেয়ে প্রিয়াংকা গোয়ালা। ছোটবেলা থেকেই চঞ্চল, ছটফটে ও পড়াশোনায় মনোযোগী। এই মেয়েটি দারিদ্র্য, সামাজিক কুসংস্কার ও বিয়ের চাপ- সব বাধা পেরিয়ে আজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন।

শ্রীমঙ্গল থেকে (AUW) যাওয়ার গল্প বলতে গিয়ে প্রিয়াংকা বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমার জীবনে শুধু স্ট্রাগল আর স্ট্রাগল। আপনারা হয়ত জানেন, বাগানের মানুষের সব ধরনের সুযোগ থাকে না। আমার বাবা একজন চা-শ্রমিক। ফলে পড়াশোনার জন্য আমাকে স্ট্রাগল করতে হয়েছে।’

প্রিয়াংকার বাবা প্রতিদিন ভোরে কাজে গিয়ে কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে পান মাত্র ১০২ টাকা মজুরি (এখন ১৭০ টাকা হয়েছে)। সেই কষ্টের মধ্যেও মেয়ের পড়াশোনার প্রতি উৎসাহে কোনো কমতি রাখেননি তিনি। তাঁদের পাঁচ সদস্যের সংসারে অভাব-অনটন যেন নিত্যসঙ্গী। ৩ ভাইবোনের পড়াশোনা, সংসার চালানো খুবই কঠিন।

প্রিয়াংকা বলেন, ‘আমি সবার বড় হওয়ায় আমাকে সবকিছুই করতে হয়েছে। পড়াশোনা, সংসারের কাজ, টিউশনি সব। মা বলতেন, মেয়েদের সবদিক থেকে পারফেক্ট থাকতে হয়। বাবা চা-শ্রমিক হলেও আমাদের পড়াশোনা করাবেন না, এমনটা কখনো বলেননি। বরং বাবা তাঁর নাশতার ৬০ টাকা বাঁচিয়ে আমাদের দিয়েছেন। আমার স্কুলের শিক্ষকগণ অনেক সহায়তা করেছেন। এভাবে এগিয়েছি। এমনও দিন গেছে, কোনো বেলা খাবারও জোটেনি। নবম শ্রেণিতে উঠেই টিউশনি শুরু করি। চা-বাগানে মেয়েদের নিয়ে সবার একটা ধারণা থাকে, ওরা কতটুকু পড়াশোনা করবে! ছোটবেলা থেকেই এ ধরনের কথা শুনেছি। কষ্ট হতো, কিন্তু থামিনি। মনে মনে বলতাম- আমি পারব।’

Advertisements

‘বাবার কষ্ট দেখেই শক্তি পেয়েছি’- বলেন প্রিয়াংকা। ‘স্কুলের পর টিউশন পড়াতাম, যাতে নিজের পড়ার খরচ কিছুটা নিজেই জোগাতে পারি। কখনো দুপুরে শুধু রুটি খেয়েছি, কিন্তু জানতাম আমি এগোচ্ছি।’

চা বাগানের অনেক মেয়ে পঞ্চম শ্রেণির পরই পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। কিন্তু প্রিয়াংকা থেমে যাননি। স্কুলের গণ্ডি পার করেছেন বেশ ভালো ফল নিয়ে। কলেজেও ভর্তি হলেন। কিন্তু ভর্তির পর আত্মীয়রা বিয়ের জন্য চাপ দিতে শুরু করলে তিনি সাহস করে নিজের বিয়ে ঠেকান। এরপর শুরু হয় তাঁর নতুন লড়াই, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার লড়াই। গোপনে আবেদন করেন চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন-এ। মেয়েদের জন্য বিশেষ বৃত্তি পেয়ে ভর্তি হন সেখানে। পাশাপাশি প্রথম আলো ট্রাস্ট ও আইডিএলসি থেকে ফার্স্ট ফিমেল ইন দ্য ফ্যামিলি ‘অদ্বিতীয়া’ শিক্ষাবৃত্তি পান। এই সহায়তাগুলো শুধু অর্থ নয়, তাঁর আত্মবিশ্বাসেরও পাথেয় হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছানো পরিবারের প্রথম নারী, যাঁরা আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে পারছেন না, তাঁদের অনুপ্রাণিত করার জন্য ২০১২ সাল থেকে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন এবং প্রথম আলো ‘ফার্স্ট ফিমেল ইন দ্য ফ্যামিলি স্কলারশিপ অ্যাওয়ার্ড’ নামে শিক্ষাবৃত্তি প্রদান শুরু করে।

AUW থেকে জনস্বাস্থ্যে স্নাতক শেষ করে প্রিয়াংকা ইন্টার্ন করেন ইনস্টিটিউট অব ওয়েলবিয়িং এ। বর্তমানে তিনি ব্রাদার্স ফার্নিচার লিমিটেড এ কমিউনিটি সেলস অফিসার হিসেবে কাজ করছেন।বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করার দিনটিই তাঁর জীবনের সবচেয়ে গর্বের মুহূর্ত। মা মুক্তির চোখে জল, আর বাবার মুখে গর্বের হাসি ‘তুই সত্যিই পারলি, মা।’

প্রিয়াংকা বলেন, ‘চা বাগান, পাহাড় বা দারিদ্র্য কোনো কিছুই তোমার স্বপ্ন থামাতে পারবে না। শিক্ষা হলো মুক্তির চাবিকাঠি।’

তাঁর আশা একদিন চা বাগানের প্রতিটি মেয়ে স্কুলে যাবে, বই হাতে নেবে, আর নিজের পায়ে দাঁড়াবে। ‘আমি পারলে, তুমিও পারবে,’ বলেন শ্রীমঙ্গলের এই সাহসী চা কন্যা।

Advertisements