বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনমঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬
নারী

শুরু হয়েছে জেন জেড প্রজন্মের স্ক্রিন আসক্তি থেকে মুক্তির লড়াই

Untitled-2

প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন এখন জেনারেশন জেডের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া এই প্রজন্ম বড় হয়েছে স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং দ্রুতগতির ডিজিটাল কনটেন্টের দুনিয়ায়। এতে দৈনন্দিন আচরণে যেভাবে স্ক্রিন আধিপত্য বিস্তার করেছে, বিশেষজ্ঞরা একে বলছেন ‘ডিজিটাল ব্রেন রট’— যা মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও মানসিক স্বাস্থ্যে নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।

ডিজিটাল ব্রেন রট: কোন জায়গায় তৈরি হচ্ছে সংকট?

গবেষকদের মতে, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারে মস্তিষ্কে ডোপামিন ক্ষরণ বেড়ে যায়। টিকটক, ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মে ছোট ভিডিওর টানা উত্তেজনা মস্তিষ্ককে দ্রুত আনন্দের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। এর ফলে—

মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে

পড়াশোনা বা দীর্ঘ সময় কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যায়

স্বল্পমেয়াদি স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়

Advertisements

উদ্বেগ ও ঘুমের সমস্যা বাড়ে

ধৈর্য কমে যায়

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল উত্তেজনার ঘনঘন আঘাতে মস্তিষ্ক স্বাভাবিক গতি হারায়— যাকে তাঁরা ‘ব্রেন রট’ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।

নতুন গবেষণায় কী পাওয়া যাচ্ছে

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে—

স্ট্যানফোর্ড ও কেমব্রিজের তথ্য বলছে, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারে মনোযোগের স্থায়িত্ব আগের তুলনায় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।

এমআইটির গবেষণা দেখায়, টানা সোশ্যাল মিডিয়া উত্তেজনায় মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস কম সক্রিয় হয়— যা স্মৃতি ধরে রাখার জন্য অপরিহার্য।

নিউরোসায়েন্টিস্টরা বলছেন, অনিয়ন্ত্রিত ডোপামিন ওঠানামায় নিউরাল কানেকশন দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে, যা ‘অ্যাক্সেলারেটেড ব্রেন এজিং’ বা দ্রুত স্নায়বিক বার্ধক্য ঘটাতে পারে।

টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় উঠে এসেছে, ডুমস্ক্রলিংয়ের কারণে উদ্বেগ, হতাশা ও ঘুমের বিঘ্ন আরও বাড়ছে।

বিপরীতমুখী আন্দোলনে এগিয়ে আসছে জেন জেড

আশ্চর্যের বিষয় হলো— যে প্রজন্ম স্ক্রিন আসক্তিতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত, তারাই এখন এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার উদ্যোগে সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই তাঁরা গড়ে তুলছেন নতুন এক ডিজিটাল সচেতনতা আন্দোলন।

অ্যান্টি–ব্রেন রট কনটেন্টের জনপ্রিয়তা

টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে অনেক কনটেন্ট নির্মাতা নিয়মিত প্রকাশ করছেন অ্যান্টি–ব্রেন রট সিরিজ। এসব ভিডিওতে থাকছে—

সকালে স্ক্রিন ছাড়া দিন শুরু

নোটিফিকেশন বন্ধ রাখার কৌশল

প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় পড়াশোনা

ফোন ছাড়া হাঁটাহাঁটি বা ব্যায়াম

ঘুমানোর আগে একটি নির্দিষ্ট সময় ফোন বন্ধ রাখা

তরুণেরা এসব ভিডিও অনুসরণ করছেন, শেয়ার করছেন এবং একে অপরকে উৎসাহ দিচ্ছেন।

জেন জেডের ‘মাসিক কারিকুলাম’—নতুন স্ব–শৃঙ্খলার মডেল

নিজস্ব মাসিক লক্ষ্য নির্ধারণ এখন তরুণদের একটি জনপ্রিয় প্রবণতা। তাঁরা সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করছেন নিজেদের মাসিক ব্যক্তিগত কারিকুলাম, যেখানে থাকে—

কমপক্ষে দুটি বই পড়ার লক্ষ্য

সপ্তাহে তিন দিন ব্যায়াম

প্রতিদিন নির্দিষ্ট স্ক্রিন টাইম

নতুন কোনো শখ শেখা

মাসে অন্তত একদিন সম্পূর্ণ অফলাইন থাকা

বাস্তবসম্মত হওয়ায় এই উদ্যোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

ফোনবিহীন সামাজিক সময়

ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে ফোন–ফ্রি ক্যাফে ও রেস্টুরেন্ট বৃদ্ধি পাচ্ছে। তরুণেরা এখন আড্ডায় ফোন দূরে রেখে বোর্ড গেম, আড্ডা কিংবা কফির সময়টুকুতে একে অপরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগে গুরুত্ব দিচ্ছেন।

প্রযুক্তি দিয়ে প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ

জেন জেড প্রজন্ম স্ক্রিন ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনতে বিভিন্ন অ্যাপও ব্যবহার করছে। ফরেস্ট, ওপাল, ওয়ান সেক, ফ্রিডম— এসব অ্যাপ স্ক্রিন টাইম কমানো, নোটিফিকেশন বাদ দেওয়া এবং মনোযোগ ধরে রাখতে ব্যাপক জনপ্রিয়।

আগামী প্রজন্মের জন্য সতর্কবার্তা

ডিজিটাল দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকা সম্ভব নয়। তবে জেন জেড নিজেদের জীবনযাপনেই তৈরি করছে নতুন ভারসাম্য। গবেষকেরা মনে করছেন, তাদের এই সচেতনতা ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ পথনির্দেশ হয়ে থাকবে।

Advertisements