বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬
নারী

সংসারে ছিলো তীব্র অর্থনৈতিক টানাপোড়েন , আজ সফল ফ্রিল্যান্সার তানিয়া

Untitled-4

মাত্র ১৪ বছর বয়স। যে বয়সে কিশোরীরা স্কুল–কলেজের স্বপ্নে মেতে থাকে, ঠিক সেই বয়সেই বাল্যবিবাহের পিঁড়িতে বসতে হয়েছিল তানিয়া নাসরিনকে। অল্প বয়সে সংসার, তারপর এক ছেলে ও এক মেয়েকে কোলে নিয়ে শুরু হয় নতুন লড়াই। পড়াশোনা শেষ করার আগেই ঘর–সংসারে ঢুকে পড়ায় চাকরি করার যোগ্যতা বা সুযোগ কোনোটাই ছিল না তার। এর মধ্যেই সংসারজুড়ে আসে তীব্র অর্থনৈতিক টানাপোড়েন।

গল্পটা এখানেই থেমে যেতে পারত কিন্তু তানিয়া হাল ছাড়েননি। সেই কঠিন সময় পাড়ি দিয়ে আজ তিনি একজন সফল ডিজিটাল ডিজাইনার। মাসে আয় করছেন এক হাজার ডলারেরও বেশি—বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার। গৃহিণী থেকে শুরু করে পড়াশোনা শেষ করে আজ তিনি প্রতিষ্ঠিত ফ্রিল্যান্সার।

ঘুরে দাঁড়ানোর শুরু

তানিয়ার বাবা আবদুল খালেক দুবাই প্রবাসী ছিলেন। ২০০১ সালে প্রবাসে তার ক্যানসার ধরা পড়ে। পরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় শুরু হয় তানিয়ার বিয়ের আলোচনা। অল্প বয়সেই তাকে বিয়ে দিতে হয়। বিয়ের দেড় মাস পর বাবা মারা যান।

Advertisements

বাবাহারা কিশোরী তানিয়ার জীবনে তখন আসে অস্থিরতা। স্বামী জাহিদ হাসান পেশায় ব্যবসায়ী তাকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে উৎসাহ দেন। কিন্তু প্রথম সন্তান জেবা ফারিহা আসায় ব্যস্ততার মধ্যে তেমন পড়াশোনা করা হয়নি। ২০০৭ সালে জন্ম নেয় দ্বিতীয় সন্তান জুবায়ের আহম্মেদ।

ঠিক তখনই তানিয়া নিজের ভেতরে নতুন শক্তি খুঁজে পান। সন্তান মানুষ করার পাশাপাশি নিজেকে গড়ে তোলার সংকল্প নেন। নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন ঢাকার লালবাগের ওয়েস্ট অ্যান্ড হাইস্কুলে। এরপর উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এইচএসসি এবং পরবর্তীতে শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্টগ্র্যাজুয়েট কলেজ থেকে বিবিএ সম্পন্ন করেন।

দক্ষতা অর্জনের লড়াই

অভাব–অনটনের দিনগুলোতে তিনি এমন কিছু খুঁজছিলেন, যা ঘরে বসেই করা যায়। এক পরিচিতর মাধ্যমে জানতে পারেন গ্রাফিক ডিজাইনের কথা—যেখানে ঘরে বসে সম্মানজনক আয় সম্ভব।

তাই ভর্তি হন ক্রিয়েটিভ আইটি ইনস্টিটিউটে। প্রথম দিকে ডিজাইন বুঝতে হিমশিম খেলেও প্রশিক্ষক হাফিজ স্যারের সহায়তায় ধীরে ধীরে নিজের দক্ষতা বাড়াতে থাকেন। বেসিক কোর্স শেষে প্রতিভা দেখে তাকে অ্যাডভান্স কোর্সে ১০০% বৃত্তিতে ভর্তি করানো হয়। সেই কোর্স শেষে তিন মাসের শিক্ষানবিশি তার ক্যারিয়ারের ভিত্তি আরও শক্ত করে।

গ্রাফিক ডিজাইনের মাধ্যমে আয়ের সূচনা হলেও তানিয়া সেখানেই থামেননি। নিজের উপার্জন দিয়েই শেখেন মোশন ডিজাইন। এরপর যুক্ত হন সময়ের জনপ্রিয় দক্ষতা ইউআই/ইউএক্স ডিজাইনে। হাসান স্যারের তত্ত্বাবধানে তিনি হয়ে ওঠেন একজন পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ডিজাইনার।

তানিয়া বলেন, “বিয়ে হয়ে যাওয়া মানেই সব শেষ নয়। পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, ইচ্ছাশক্তি থাকলে পথ বের হয়।”

বর্তমান সাফল্য—এখন তিনি অনুপ্রেরণা

আজ তানিয়া কাজ করছেন অ্যাডোবি স্টক, শাটারস্টক, ফাইভারসহ আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে। প্যাসিভ ও অ্যাক্টিভ মার্কেটপ্লেস মিলিয়ে তার মাসিক আয় এক হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায়।

তিনি বলেন, “একসময় সংসারের খরচ নিয়ে চিন্তা করতাম, আজ নিজের জায়গা তৈরি করতে পেরেছি। আমার মেয়ে এখন জাপানে স্নাতক পড়তে যাচ্ছে, ছেলেরও বিদেশে পড়ার পরিকল্পনা আছে। সব বাধা ভেঙে উঠতে পেরেছি।”

ভবিষ্যতে তিনি নারীদের নিয়ে কাজ করতে চান

“নারীর জীবন–সংগ্রাম আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। আমি চাই, মেয়েরা যেন হাল না ছাড়ে। ঘরের কোণ থেকেও ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব—আমি তার জীবন্ত উদাহরণ।”

Advertisements