বাংলাদেশের নারী-উত্থানে প্রশ্ন—“অর্জন কি রাজনৈতিক নীতিতে ঝুঁকির মুখে?”

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান সম্প্রতি এমন একটি ঘোষণা দিয়েছেন, যা বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তার দাবি—ক্ষমতায় গেলে কর্মজীবী নারীদের আর প্রতিদিন আট ঘণ্টা কাজ করতে হবে না; পাঁচ ঘণ্টাই যথেষ্ট।
এমনকি, এই কম কাজের কারণে যে আর্থিক ক্ষতি হবে, সেটাও সরকার ভর্তুকি দিয়ে পূরণ করবে। আর যেসব নারী বাইরে না গিয়ে ঘরের দায়িত্ব নেবেন সেই ‘হোমমেকার’দের হাতেও পৌঁছবে সরকারি ভাতা।
ধারণা করা যায়, এমন বড় ঘোষণা নীতিনির্ধারণী মহলের আলোচনার পরেই এসেছে—এবং দলটির নির্বাচনি ইশতেহারেও বিষয়টি উঠবে।
সরল দেখায়, রাজনৈতিক লাভে ভরপুর
প্রস্তাবটি আপাতদৃষ্টিতে নারী-সহায়ক মনে হতে পারে। বিশ্বের বহু অর্থনীতিবিদ ‘ডাইরেক্ট ক্যাশ ট্রান্সফার’কে দারিদ্র্য কমানোর কার্যকর উপায় হিসেবে সমর্থন করেন।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও মমতা ব্যানার্জির জনপ্রিয় প্রকল্প ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ এর উদাহরণ আছে—যেখানে সমাজের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল নারীরা প্রতি মাসে ভাতা পান। রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও প্রকল্পটি বিপুল জনপ্রিয়তা ও নির্বাচনি সুবিধা এনে দিয়েছে শাসকদলকে।
জামায়াতের প্রস্তাবে তাই ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর ছায়া দেখা অস্বাভাবিক নয়।
কিন্তু বিপদ কোথায়?—কর্মক্ষেত্রেই বন্ধ হবে দরজা
ভাতা দেওয়া বা আর্থিক সহায়তা সমস্যা নয়—সমস্যা শুরু হয় কর্মঘণ্টা কমানোর সিদ্ধান্তে। একটি কোম্পানি যদি জানে, নারীদের দিয়ে দিনে পাঁচ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো যাবে না, তাহলে তারা কেন একজন নারীকে নিয়োগ দেবে? ইতোমধ্যেই যেখানে নারীরা ভালো বেতনের চাকরিতে কম সুযোগ পান, সেখানে পাঁচ ঘণ্টার ‘সিলিং’ মানে হবে আরও বড় বাধা।
বিবিসির প্রতিবেদনে অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান হিসাব দিয়ে বলেছেন—শুধু গার্মেন্টস খাতে এই নীতি কার্যকর করতে সরকারকে বছরে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। প্রশ্ন হলো—বাস্তবে কোন সরকার এত বড় বোঝা বহন করতে পারবে?
দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতা: নারীরা শিক্ষিত—কাজের সুযোগ নেই
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আমাদের এই অঞ্চলে নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ বিশ্বে সবচেয়ে কমের মধ্যে—মাত্র ২২–২৩ শতাংশ।
পুরুষদের ৭৭ শতাংশ যেখানে কর্মরত, নারীদের ক্ষেত্রে সেই হার মাত্র ৩১ শতাংশ।
শিক্ষার অগ্রগতি, শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস, মোবাইল প্রবেশ—সব অর্জন সত্ত্বেও দক্ষিণ এশিয়ার নারীরা ভালো চাকরি পাচ্ছেন না।
স্টেম বিষয়ে তিন-চতুর্থাংশ শিক্ষার্থীই পুরুষ—ফলে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন চাকরির বাজারেও মেয়েরা শুরু থেকেই পিছিয়ে।
ভারতের উদাহরণ: জনবহুল দেশেও চাকরিতে নারীদের সংকট
ডয়চে ভেলের একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে—ভারতে বিভিন্ন খাতে নারীদের চাকরি ছাড়ার প্রবণতা বাড়ছে। দিল্লির মিডিয়া কনসালট্যান্ট আমনজিৎ কাউর থেকে শুরু করে পাঞ্জাবের স্কুলশিক্ষক রূপী সিং—বিয়ের পর চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন অনেকে। শিক্ষিত নারীরাও এখন সামান্য খরচের জন্য স্বামীর ওপর নির্ভরশীল—এক অস্বস্তিকর সামাজিক বাস্তবতায়।
আফগানিস্তান: রাতারাতি মুছে যাওয়া এক প্রজন্মের স্বপ্ন
তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর আফগান নারীরা কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা, এমনকি জনজীবন থেকেও প্রায় মুছে গেছেন।
এক মার্কিন এনজিওয় কর্মরত সোহিনী সরকারের অভিজ্ঞতা— “নারী সহকর্মীরা কুড়ি বছরের অর্জন হারিয়ে এক বিকেলে বাড়ি ফিরে এলেন… ভয়, হুমকি, মৃত্যুর আশঙ্কায়।”
আজ সেই আশঙ্কা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি হয়েছে—কিন্তু বিশ্ব চুপ।
বাংলাদেশের গল্প: কর্মজীবী নারীদের ঘামেই বদলে যাওয়া এক দেশ
বাংলাদেশের উত্থানের গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল কর্মজীবী নারী। গার্মেন্টস শিল্পে লক্ষ লক্ষ তরুণী শুধু নিজেদের নয়—দেশকেও দারিদ্র্যের অন্ধকার থেকে টেনে তুলেছেন। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে—কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণে বাংলাদেশ (৪৪%) ভারতের (৩৩%) চেয়ে অনেক এগিয়ে।
এই অগ্রগতি রাতারাতি হয়নি—পরিশ্রম, সাহস এবং স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ের ইতিহাস এটি।



