২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | শুক্রবারবাংলা: ১০ আশ্বিন ১৪৩৩
ধর্ম

জুমার দিনের হারিয়ে যাওয়া ৮ গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত ও আমল

জুমার দিনের হারিয়ে যাওয়া ৮ গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত ও আমল

সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন জুমাবার হলো উম্মতে মুহাম্মাদির জন্য সাপ্তাহিক উৎসব ও অফুরন্ত বরকত অর্জনের সুবর্ণ সময়। কুরআন ও হাদিসে এ দিনের অপরিসীম মর্যাদা ও ফজিলতের কথা বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা ও অবহেলার কারণে জুমার দিনটি অনেকের কাছেই এখন কেবল গোসল করা ও দুই রাকাত ফরজ নামাজ আদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দিনটিকে ঘিরে কিছু বিশেষ আমল ও সুন্নতের নির্দেশনা দিয়ে গেছেন, যা চর্চার অভাবে আজ প্রায় বিস্মৃত। হাদিসের সুস্পষ্ট প্রমাণের আলোকে জুমার দিনের সেই উপেক্ষিত ও অত্যন্ত বরকতময় সুন্নতগুলো নিম্নে আলোচনা করা হলো।

ফজরের নামাজে বিশেষ দুটি সুরা পাঠ

জুমার দিনের সূচনা হয় ফজরের নামাজের মাধ্যমে। এ দিনের ফজরের জামাতে বিশেষ দুটি সুরা তেলাওয়াত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নত, যা বর্তমানে অনেক মসজিদেই চর্চা করা হয় না। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত:

أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَقْرَأُ فِي فَجْرِ يَوْمِ الْجُمُعَةِ الم تَنْزِيلُ (السَّجْدَةَ) وَهَلْ أَتَى عَلَى الإِنْسَانِ

‘রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার দিনে ফজরের নামাজে ‘সুরা আস-সাজদা’ এবং ‘সুরা আল-ইনসান’ তেলাওয়াত করতেন।’ (আবু দাউদ: ১০৭৪)

যত দ্রুত সম্ভব মসজিদে যাওয়া

Advertisements

খুতবা শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে বা জামাত শুরুর সময় মসজিদে যাওয়া বর্তমানে সাধারণ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অথচ জুমার দিন যত আগে মসজিদে প্রবেশ করা যায়, তার প্রতিদান তত বেশি। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

مَن اغْتَسَلَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ غُسْلَ الْجَنَابَةِ ثُمَّ رَاحَ فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ بَدَنَةً…

‘জুমার দিন মসজিদের দরজায় ফেরেশতারা অবস্থান করেন এবং ক্রমানুসারে আগে আগমনকারীদের নাম লিখতে থাকেন। যে ব্যক্তি সবার আগে উপস্থিত হয়, সে যেন একটি মোটাতাজা উট কুরবানি করল। এরপর যে আসে, সে একটি গাভী কুরবানি করার সওয়াব পায়। অতঃপর আগমনকারী ব্যক্তি একটি মেষ কুরবানি করার সমান সওয়াব লাভ করে। এরপর যে আসে সে একটি মুরগি এবং তার পরবর্তীতে আগমনকারী ব্যক্তি একটি ডিম দান করার পুণ্য পায়। এরপর ইমাম যখন খুতবা দিতে বের হন, তখন ফেরেশতারা তাঁদের খাতা বন্ধ করে দেন এবং মনোযোগ দিয়ে খুতবা শুনতে থাকেন।’ (বুখারি: ৯২৯)

পায়ে হেঁটে মসজিদে গমন

যানবাহনের ব্যাপক সুবিধার কারণে হেঁটে মসজিদে যাওয়ার সুন্নতটি দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ সামর্থ্য থাকলে পায়ে হেঁটে জুমার জামাতে শামিল হওয়ার রয়েছে অনন্য প্রতিদান। হজরত আউস ইবনে আউস (রা.) বর্ণনা করেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি:

مَنْ غَسَّلَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ وَاغْتَسَلَ ثُمَّ بَكَّرَ وَابْتَكَرَ وَمَشَى وَلَمْ يَرْكَبْ…

‘যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করে পায়ে হেঁটে মসজিদে যাবে, ইমামের কাছাকাছি বসবে, মনোযোগ দিয়ে খুতবা শুনবে এবং কোনো অনর্থক কাজ করবে না, সে মসজিদে যাওয়ার প্রতি কদমে এক বছর নফল রোজা ও এক বছর রাতে নফল ইবাদতের সওয়াব পাবে।’ (আবু দাউদ: ৩৪৫)

মিসওয়াক ও আতর ব্যবহার

টুথপেস্ট বা অন্যান্য উপকরণের ব্যবহার বাড়লেও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অন্যতম প্রিয় আমল ‘মিসওয়াক’ আজ অবহেলিত। জুমার দিনে মিসওয়াক করা এবং সুগন্ধি মাখা বিশেষ সুন্নত। হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:

غُسْلُ يَوْمِ الْجُمُعَةِ عَلَى كُلِّ مُحْتَلِمٍ وَسِسَاكٌ وَيَمَسُّ مِنْ الطِّيبِ مَا قَدَرَ عَلَيْهِ

‘জুমার দিন প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির গোসল ও মিসওয়াক করা দায়িত্ব এবং সাধ্য অনুযায়ী সুগন্ধি ব্যবহার করা কর্তব্য।’ (মুসলিম: ৮৪৬)

অধিক পরিমাণে দরুদ পাঠ

জুমার দিনে প্রিয়নবী (সা.)-এর প্রতি বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পেশ করা একটি বরকতময় আমল। হজরত আউস ইবনে আউস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

إِنَّ مِنْ أَفْضَلِ أَيَّامِكُمْ يَوْمَ الْجُمُعَةِ… فَأَكْثِرُوا عَلَيَّ مِنَ الصَّلَاةِ فِيهِ

‘তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিনটি সর্বোত্তম… অতএব এই দিনে তোমরা আমার ওপর বেশি করে দরুদ পাঠ করো। কারণ তোমাদের দরুদ আমার সামনে পেশ করা হয়।’ তখন সাহাবিরা আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার পর আমাদের দরুদ কীভাবে আপনার কাছে উপস্থাপন করা হবে? জবাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ নবীদের দেহ ভক্ষণ করা মাটির জন্য হারাম করে দিয়েছেন।’ (আবু দাউদ: ১০৪৭)

সুরা কাহাফ তেলাওয়াত

জুমার দিনের অন্যতম ফজিলতপূর্ণ আমল হলো পুরো সুরা কাহাফ পাঠ করা। হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

مَنْ قَرَأَ سُورَةَ الْكَهْفِ يَوْمَ الْجُمُعَةِ أَضَاءَ لَهُ مِنَ النَّوْرِ مَا بَيْنَ الْجُمُعَتَيْنِ

‘যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহাফ তেলাওয়াত করবে, তার জন্য দুই জুমার মধ্যবর্তী দিনগুলো বিশেষ নূরে আলোকিত হয়ে থাকবে।’ (বাইহাকি: ৫৭৯৩)

খুতবার সময় সম্পূর্ণ নীরবতা পালন

ইমামের খুতবা চলাকালে পুরোপুরি নীরব থাকা ওয়াজিব। এ সময় কথা বলা এমনকি অন্য কাউকে কথা বলতে নিষেধ করাও আদবের পরিপন্থী। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

إِذَا قُلْتَ لِصَاحِبِكَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ أَنْصِتْ وَالْامامُ يَخْطُبُ فَقَدْ لَغَوْتَ

‘জুমার দিন ইমাম যখন খুতবা দিতে থাকেন, তখন তুমি যদি তোমার পাশের জনকে বলো ‘চুপ করো’, তবে তুমি একটি অনর্থক বা অসার কাজ করলে।’ (বুখারি: ৯৩৪)

এ ছাড়া খুতবা চলাকালে মোবাইল ফোন ব্যবহার করা, ফিসফিস করে আলাপ করা কিংবা অন্যমনস্ক থাকাও খুতবার ভাবগাম্ভীর্য নষ্ট করে।

দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্তের সন্ধান

জুমার দিনে এমন একটি শুভ মুহূর্ত রয়েছে, যখন বান্দা আল্লাহর কাছে যা প্রার্থনা করে, তা-ই কবুল করা হয়। দুর্ভাগ্যবশত এই মহামূল্যবান সময়টির অন্বেষণে অধিকাংশ মানুষ গাফেল থাকে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার দিনের মাহাত্ম্য উল্লেখ করে বলেন:

ذَكَرَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ فَقَالَ فِيهِ سَاعَةٌ لَا يُوَافِقُهَا عَبْدٌ مُسْلِمٌ وَهُوَ قَائِمٌ يُصَلِّي يَسْأَلُ اللَّهَ شَيْئًا إِلَّا أَعْطَاهُ إِيَّاهُ

‘জুমার দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, কোনো মুসলিম বান্দা যদি সেই মুহূর্তে নামাজরত অবস্থায় মহান আল্লাহর কাছে কিছু চায়, তবে তিনি তাকে তা অবশ্যই প্রদান করেন।’ (বুখারি: ৯৩৫)

অধিকাংশ ইসলামিক স্কলার ও হাদিস বিশারদদের মতে, এই কাঙ্ক্ষিত সময়টি লুকিয়ে রয়েছে আসরের নামাজের পর থেকে সূর্যাস্তের মধ্যবর্তী সময়ে।

জুমার দিন নিছক কোনো সাপ্তাহিক ছুটির দিন নয়; বরং আত্মশুদ্ধি, তাওবা ও প্রভুর সান্নিধ্য লাভের এক অনন্য উপলক্ষ। অবহেলায় হারিয়ে যাওয়া এই সুন্নতগুলো বাস্তব জীবনে ধারণ করার মাধ্যমে যেমন বিপুল সওয়াব অর্জন সম্ভব, তেমনি নবীজির (সা.) জীবনাদর্শকেও জাগ্রত রাখা যায়।

Advertisements