‘জননী’ প্রকল্পের ছোঁয়ায় রংপুরে নিরাপদ প্রসবের জাগরণ

রংপুরের এক ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে ঢুকতেই চোখে পড়ে এক ভিন্ন দৃশ্য। দুপুরবেলা, তবুও পুরো কেন্দ্র জুড়ে কর্মব্যস্ততা। প্রসব বেদনায় ভুগতে থাকা এক গর্ভবতী মা হাসপাতাল প্রাঙ্গণে পৌঁছাতেই পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা (FWV) এগিয়ে এসে তাকে নিয়ে গেলেন ডেলিভারি রুমে। দ্রুতই যোগ দিলেন মিডওয়াইফ ও সহকারী কর্মীরা। শুরু হলো পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ এবং পরিবারের সদস্যদের পরামর্শ দেওয়া—সবই পরিকল্পিতভাবে, সবই সময়মতো।
এখন এই কেন্দ্রটি ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। ফলে দিনের যে কোনো সময়ই সেবা পাওয়া যায়—এমন বাস্তবতা থেকে নতুন বাবা সন্তুষ্ট কণ্ঠে বললেন, “আগে সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় এমন প্রস্তুতি দেখিনি। এখন ভরসা করতে পারছি।”
এই পরিবর্তন রংপুরের একক কোনো কেন্দ্রেই সীমাবদ্ধ নয়। রংপুর ও লালমনিরহাট জেলায় ২০২৩ সাল থেকে চালু হওয়া “জননী প্রকল্প” সরকারি মাতৃ ও নবজাতক সেবাকে নতুনভাবে সাজানোর লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগ, পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ, স্থানীয় সরকার ও সাধারণ মানুষ—সবাইকে যুক্ত করে গড়ে উঠেছে এই সমন্বিত উদ্যোগ।

প্রকল্প–সহায়িত কেন্দ্রগুলোয় ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছে প্রায় ১২,০০০টি নিরাপদ স্বাভাবিক প্রসব (NVD)। এটি শুধু পরিসংখ্যান নয়—এটি সরকারি সেবার ওপর জনগণের বাড়তি আস্থার প্রমাণ।
একসময় জনবল সংকট, সীমিত সরঞ্জাম ও অনিয়মিত সেবার কারণে সরকারি কেন্দ্রগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার কম ছিল। কিন্তু জননী প্রকল্প ও সরকারের যৌথ উদ্যোগে সেবার মান উন্নয়ন, জনবল শক্তিশালীকরণ এবং স্থানীয় সরকারকে যুক্ত করার ফলে সেই চিত্র বদলে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা বাড়াতে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সঙ্গে যৌথভাবে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ:
- লজিস্টিক ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (LMIS)
- প্রসব ও নবজাতক সেবায় জীবনরক্ষাকারী স্কিল
- হাতে-কলমে দক্ষতা মূল্যায়ন ও রিফ্রেশার ট্রেনিং
ফলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো এখন আরও সুশৃঙ্খল—
- ওষুধ সরবরাহ পরিকল্পনা
- ডেলিভারি কিট সংরক্ষণ
- তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ—
সবক্ষেত্রেই দৃশ্যমান উন্নতি এসেছে। এসব পরিবর্তন মাতৃ ও নবজাতক সেবাকে শুধু উন্নতই করেনি, করেছে টেকসই।

জননী প্রকল্প শুধু স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের ভেতরের পরিবর্তনেই সীমাবদ্ধ নয়। সেবা–গ্রহীতাদের আস্থা ও অংশগ্রহণ বাড়াতেও নেওয়া হয়েছে নতুন উদ্যোগ—সিটিজেন ডায়লগ সেশন।
এই সেশনগুলোতে একই প্ল্যাটফর্মে বসেন
- স্থানীয় জনপ্রতিনিধি,
- সেবা–গ্রহণকারী,
- সেবা–দাতা স্বাস্থ্যকর্মীরা।
এখানেই উঠে আসে বাস্তব সমস্যাগুলো—ডকুমেন্টেশন জটিলতা, জনবল ঘাটতি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সমস্যা চিহ্নিত করার সঙ্গে সঙ্গে এগুলো সমাধানে স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।



