অ/গ্নিকাণ্ডে প্রতিবন্ধী বকুলের প্রাণ বাঁচালো প্রতিবেশী কিশোর

মঙ্গলবার বিকেলে কড়াইল বস্তিতে হঠাৎ দাউদাউ করে আগুন ছড়িয়ে পড়লে ৪৫ বছর বয়সী বকুল বেগম ছিলেন ছোট্ট ঘরের বিছানায়। চলাফেরায় অক্ষম বকুল আতঙ্কে চিৎকার শুরু করলেও নিজে থেকে কিছুই করতে পারছিলেন না। সেই চিৎকারই পৌঁছে যায় পাশের ঘরের এক কিশোরের কানে। বয়স মাত্র ১৪–১৫, তবু প্রাণপণ দৌড়ে এসে সে আগুনের উত্তাপ ছাপিয়ে বকুলকে উদ্ধার করে বের করে আনে।
কিশোরটি প্রথমে বকুলকে বিছানা থেকে তুলে নিয়ে হুইলচেয়ারে বসায়। তারপর ভয়াবহ আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে হুইলচেয়ার ঠেলে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়। তার দ্রুত সিদ্ধান্ত ও সাহস না থাকলে বকুলের প্রাণ রাখা কঠিন হতো।
বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে শুরু হওয়া আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিট রাতে ৯টা পর্যন্ত লড়াই করেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। টিন, বাঁশ, কাঠ আর লোহায় তৈরি একতলা–তিনতলা বিশাল ওই বস্তি অল্প সময়েই জ্বলতে থাকে। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, বাসিন্দারা ছুটে এসে চাপকল ও খাল থেকে পানি এনে চেষ্টা চালান আগুন থামানোর।
২৬ বছর ধরে এই বস্তিতেই থাকেন বকুল বেগম। দুর্ঘটনায় কোমর ভেঙে যাওয়ার পর প্রায় নয় বছর ধরে হুইলচেয়ারের ওপর নির্ভরশীল তিনি। রিকশাচালক স্বামী বিল্লাল হোসেন ১৭ বছর আগে তাকে পাঁচ সন্তানসহ ছেড়ে চলে যান। সংসারের হাল ধরার ভার তখন পড়ে তাঁর ওপরই। মাটি কাটার কাজ থেকে শুরু করে নির্মাণশ্রমিকের কাজ—সবই করেছেন সন্তানদের মানুষ করার জন্য। পরে গাছ কাটার কাজ করতে গিয়েই গুরুতর আহত হন।
হুইলচেয়ারে বসেই তিন মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন, দুই ছেলে কাছাকাছি ঘরে থাকে। আজকের আগুনে তাদের সবার ঘর পুড়ে ছাই। বকুলের সবকিছু মুহূর্তেই নিশ্চিহ্ন।
বকুলের কণ্ঠে হাহাকার— ‘স্বামী ছাইড়া গেছে, নিজেরে নিজে টেনে সংসার চালাইছি। আজ আগুনে সব শেষ হইয়া গেল।’
বস্তিতে শতাধিক পরিবার এখন ঘরহারা। বকুলের পুত্রবধূ সুবর্ণা বলেন, “সবার বাসাই পুড়ে গেছে। আমরা কিছুই বের করতে পারিনি।”
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী রাত ৯টার দিকে জানান, “কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও আমরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছি। বস্তির পূর্ব-উত্তর পাশে এখনো আগুন জ্বলছে।”
মানুষ যেখানে জীবনের লড়াই করে, সেই কড়াইল আজও এক শিশুকিশোরের অদম্য সাহসে দেখল অন্যরকম এক মানবতার ছবি।



