বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬
স্পটলাইট

চ্যাটজিপিটি কি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির স্বপ্ন ভাঙতে পারে?

120-SM903475

প্রতি বছর ইউরোপ ও আমেরিকার নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চান বিশ্বের নানা দেশের শিক্ষার্থীরা। সেই তালিকায় বাংলাদেশের তরুণদের অবস্থানও কম নয়। সাধারণত এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করার সময় শিক্ষার্থীদের নিজের সম্পর্কে এবং পড়াশোনার উদ্দেশ্য নিয়ে একটি প্রবন্ধ বা স্টেটমেন্ট অব পারপাস (SOP) লিখতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে অনেকে এই লেখার কাজটি সহজ করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) টুল, যেমন চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করছেন।

কিন্তু প্রযুক্তিবিষয়ক সাময়িকী ম্যাশেবল সতর্ক করেছে—বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন লেখায় এআইয়ের উপর পুরোপুরি নির্ভর করা মোটেও সঠিক নয়।

ভর্তি বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা

ম্যাশেবল জানায়, চ্যাটজিপিটির মতো টুল দেখে অনেকেই ভাবেন—এআই দিয়ে সহজেই ভালো লেখা বানানো সম্ভব। কিন্তু ভর্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি এক ধরনের বিপজ্জনক শর্টকাট।

ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর কলেজ অ্যাডমিশন কাউন্সেলিং–এর সদস্য ড. জেনিফার কার্ক বলেন, “ভর্তির আবেদন হলো একদম সাদা ক্যানভাস—যেখানে নিজের অনুভূতি ও চিন্তাকে রঙের মতো মিশিয়ে দিতে হয়। কিন্তু যদি পুরো লেখাটা এআই দিয়ে বানানো হয়, তাহলে সেখানে নিজের ছাপটাই হারিয়ে যায়।”

Advertisements

তিনি আরও বলেন, এআই তৈরি লেখায় প্রায়ই তথ্যগত ভুল, অদ্ভুত বাক্যগঠন ও একঘেয়ে ভাষা দেখা যায়। তাছাড়া একই প্রশ্নে অনেক আবেদনকারী যদি একই এআই টুল ব্যবহার করে, তাদের লেখা প্রায় একরকম হয়ে পড়ে—যা ভর্তি কর্মকর্তাদের নজর এড়ায় না।

নিজের অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিত্বই মুখ্য

ভর্তির আবেদনপত্রে সাধারণত শিক্ষার্থীদের নিজের প্রতিভা, অভিজ্ঞতা বা জীবনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে লিখতে বলা হয়। অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অতিরিক্ত ছোট প্রবন্ধও চায়—যেমন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলে চারটি প্রশ্নের উত্তর চায়, আর হার্ভার্ড চায় পাঁচটি ছোট প্রবন্ধ।

এমন চাপের মুখে অনেকে ভাবেন, “এআই টুল ব্যবহার করলে কাজটা সহজ হয় না?” কিন্তু ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কর্মকর্তা কনি লিভিংস্টন বলেন, “যে লেখায় আবেদনকারীর নিজস্বতা ও সৃজনশীলতা ফুটে ওঠে, সেটিই আলাদা হয়ে দাঁড়ায়। একজন শিক্ষার্থীর শেখার মানসিকতা ও ব্যক্তিত্ব কেবল সে নিজেই প্রকাশ করতে পারে—এআই নয়।”

তিনি আরও সতর্ক করেন, কেউ যদি নিজের ব্যক্তিগত তথ্য বা অভিজ্ঞতা এআইকে দিয়ে লেখাতে চান, তাতে গোপনীয়তার ঝুঁকি তৈরি হয়, কারণ কিছু এআই মডেল সেই তথ্য অনলাইনে ফাঁস করতে পারে।

ভর্তি কর্মকর্তাদের চোখ এড়ায় না

ড. কার্কের মতে, ভর্তি কর্মকর্তারা প্রতিদিন হাজারো আবেদন পড়েন। তারা সহজেই বুঝতে পারেন কোন লেখায় এআইয়ের ছোঁয়া আছে—বাক্যগঠন, বিরামচিহ্ন বা শব্দচয়ন থেকেই সেটা স্পষ্ট হয়। নিস্তেজ, প্রাণহীন লেখা পড়লেই সন্দেহ জাগে।

কখন এআই ব্যবহার করা যেতে পারে

তবুও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই পুরোপুরি নিষিদ্ধ নয়—তবে এর ব্যবহার সীমিত ও সতর্ক হতে হবে।

ড. কার্ক পরামর্শ দেন, প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা জেনে নেওয়া উচিত—তারা এআই ব্যবহারের অনুমতি দেয় কি না।

কনি লিভিংস্টন বলেন, নিয়ম জানা হয়ে গেলে নিচের কয়েকটি ক্ষেত্রে এআই সহায়ক হতে পারে—

লেখার আইডিয়া বা আউটলাইন তৈরি

প্রুফরিডিং বা ছোটখাটো সংশোধন

গবেষণার জন্য প্রাথমিক তথ্য অনুসন্ধান

তবে এআই থেকে পাওয়া তথ্য অবশ্যই যাচাই করতে হবে, কারণ এটি প্রায়ই ভুল করে। ড. কার্কের ভাষায়, “এআইকে চিন্তা করার বা বিষয় বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। মূল ভাবনা সবসময় শিক্ষার্থীর নিজের হওয়া প্রয়োজন।”

তিনি পরামর্শ দেন, শিক্ষার্থী চাইলে দুটি খসড়া লিখে এআইকে দিয়ে তুলনা করাতে পারেন—এতে বাক্যগঠন উন্নত করা যাবে, কিন্তু লেখাকে ‘চমকপ্রদ’ বানাতে এআই ব্যবহার করা ঠিক নয়।

শেষ পর্যন্ত, ভর্তি কর্মকর্তারা বুঝে ফেলেন কোন লেখা সত্যিকারের, আর কোনটি ‘নিখুঁত কিন্তু প্রাণহীন’।

কনি লিভিংস্টন বলেন, “এআই হয়তো ভালো লেখা দিতে পারে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় সেই শিক্ষার্থী, যার লেখায় হৃদয়, ব্যক্তিত্ব আর সৃজনশীলতার ছাপ থাকে। সেই লেখাই অসাধারণ।”

Advertisements